পায়রা

মায়ের সাথে ভালো করে কথা শেষ না করেই রচনা mobile phone টাকে বিছানার এক কোনে ছুঁড়ে ফেলে দিল | রাগে, হতাশায় তার শরীর কাঁপতে থাকলো | নিমেষের মধ্যে চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল | বিছানায় আছড়ে পড়ে, বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকলো সে |

মা কী করে তার সঙ্গে এইরকমটা করতে পারল? একমাস ধরে যে প্ল্যানটা সে করেছিল, মা সেটা শেষ মুহুর্তে নষ্ট করে দিল | তাও কিনা একটা তুচ্ছ পায়রার জণ্য ! এই কী একমাত্র সন্তানের প্রতি মায়ের ভালবাসা | নিজের মেয়ের থেকে একটা অজানা পায়রা মায়ের কাছে বড় হল? আর কোথাকার কোন পায়রা, উড়ে এসে জুড়ে বসলো আর তার সমস্ত প্ল্যান বানচাল করে দিল | তার সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল ঐ পায়রাটার উপর |

রচনার স্বপ্নভঙ্গ মণের কথা বর্ণনা করতে গেলে জটিলতাই বাড়বে | তাই পাঠকদের সুবিধার জণ্য ঘটনার প্রেক্ষাপট আমি যথাসম্ভব সংক্ষেপে বলছি |

রচনা তার স্বামী অবিনাশের সঙ্গে Hyderabad এ থাকে | তাদের দুই বছরের ছেলে শুভ (ডাকনাম বিল্টু) কিছুদিন যাবৎ play school এ যাওয়া শুরু করেছে | অবিনাশ একটা accounting farm এ audit এর কাজ করে | কর্মীসংখ্যা কম বলে অফিসে তার কাজের চাপ প্রচুর | সে বেশ সকালবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় এবং দেরীতে ফেরে | Weekend গুলোতেও রেহাই নেই | প্রায় প্রতি শনিবার অফিস যেতে হয় | রচনা বাড়িতে বিল্টুকে নিয়ে একাই থাকে | বিল্টু ভিষণ দুরন্ত ছেলে, ফলে তাকে সারাদিন সামলে আর সংসারের বাকি কাজ করে সে বেশ ক্লান্ত থাকে | অবিনাশ বাড়ি ফিরলে তকে সে ভালো করে সময় দিয়ে পারে না | অবিনাশ যদিও এই নিয়ে complain করে না, তবু এই ব্যাপারটা নিয়ে সে বেশ depressed থাকে |

রচনার মা কলকাতায় থাকেন | তার বাবা সাত বছর হল গত হয়েছেন | মা কাকাদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকেন | কিন্তু সম্পত্তির ঝামেলার জণ্য তাদের সঙ্গে মুখ দেখাদেখি বন্ধ | বিয়ের পর থেকেই বিধবা মা একাই সংসার চালান | যদিও উনার একজন সঙ্গী ছিল – একটি পোষা বিড়াল | কিন্তু দুই মাস হল সে মারা গেছে | রচনার মা pets খুব ভালবাসেন | রচনা ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে কুকুর, বিড়াল দেখে অভ্যস্ত | তার ছোটবেলা থেকে বিয়ে পর্যন্ত কোনো সময়ে এমন হয়নি যে তাদের বাড়িতে কোনো pets ছিল না | এক এক সময় তার মায়ের উপর ভীষণ রাগ হতো এই নিয়ে | তার মা এত বেশি সময় ওদের দিতেন যে সে নিজেকে অবহেলিত মণে করতো | এই ব্যাপারে মা কে বললে উনি বলতেন যে ওরা কথা বলতে পারে না বলে ওদের অনেক বেশি attention দেওয়া প্রয়োজন |

October মাসের শেষের দিকে একদিন অবিনাশ রচনাকে এসে জানায় November এর শেষের দিকে সে এক সপ্তাহের জণ্য ছুটি পাবে | এত কম দিনের ছুটিতে কলকাতায় যাওয়া সম্ভব নয় | তাই সে প্রস্তাব দেয় কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জণ্য | রচনার মণ খুশিতে ভরে যায় | বিল্টু জন্মাবার পর থেকে তাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় নি | সে মণে মণে ঠিক করে Kerala যাওয়ার | Kerala-র backwater এ তার যাবার ইচ্ছে অনেকদিনের | অবিনাশও রাজি হয়ে যায় | রচনার মা তার বাবার মৃত্যুর পর কোথাও ঘুরতে যান নি | বহুদিনের বিড়ালটা মারা যাবার পর মায়ের মনটা খুব ভালো থাকে না | এছাড়া বিল্টু মায়ের কাছে খুব ভালো থাকে | তার মা থাকলে বিল্টুকে একেবারে সময় দিতে হয় না | তাই মা তাদের সাথে বেড়াতে গেলে সে অবিনাশকে পুরো সময়টাই দিতে পারবে | এই কথা ভেবে সে অবিনাশকে রাজি করায় তার মা কে আনবার জণ্য | সেইমতো যাবার এক সপ্তাহ আগে তার মায়ের ট্রেন এর ticket কাটা হয় | উদ্দীপ্ত রচনা মণে মণে ঠিক করতে থাকে কোনদিন তারা কোথায় ঘুরতে যাবে, কোন dress টা পরবে | উত্তেজনায় কেটে যায় বেশ কিছু দিন | মায়ের রওনা হবার হপ্তাখানেক আগে হটাৎ এক সমস্যার উদয় হয় – সেই পায়রা | তার মা বিকেলে ছাতে হাটতে গিয়ে দেখতে পান একটি পায়রা পড়ে আছে | ডানায় আঘাত পাবার জণ্য উড়বার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে | তার মা তাকে ঘরে নিয়ে এসে সেবা শুশ্রুষা করতে থাকেন | রচনা আপত্তি জানায় – কিন্তু উনি আশ্বাস দেন যে রওনা হবার আগেই পায়রাটা সুস্থ হয়ে উঠবে | পাখিরা তাড়াতাড়ি recover করে | কেটে যায় আরো কিছুদিন | কিন্তু পায়রাটি সুস্থ হয়ে ওঠে না | দুদিন আগে তার মা গড়িমসি শুরু করেন | পায়রাটি সুস্থ না হলে তিনি যাবেন কী করে | রচনা উনাকে vet clinic এ যেতে পরামর্শ দেয় | সেইমতো তার মা গিয়ে কিছু ওষুধ নিয়ে আসেন | কিন্তু তবু পায়রাটি উড়বার মতো সক্ষমতা পায় না |

আজ তার মায়ের রওনা হবার কথা ছিল | অবিনাশ ও বিল্টু বেরিয়ে যাবার পর সে মাকে ফোনে করেছিল | কিন্তু তার মা জানান যে তিনি যেতে পারবেন না | পায়রাটা এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে নি | একটা অবলা প্রাণী ঘটনাক্রমে ওনার আশ্রয়ে এসে পড়েছে | উনি চলে এলে পায়রাটা কোনভাবেই বাঁচবে না আর সেই মৃত্যুর জণ্য উনিই দায়ী হবেন | বৃদ্ধ বয়েসে এতবড় পাপ উনি করতে পারবেন না | রচনা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু উনি সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন | এটাই রচনার আশাভঙ্গের উপাখ্যান |

বিছানার বালিশটা তার কান্নায় ভিজে গেছে | মনটাকে শক্ত করার চেষ্টা করে সে | সে তার মাকে চেনে | decision এর নড়চড় কোনভাবেই হবে না | ওদিকে বিল্টুর ফেরার সময় হয়ে আসছে | অবিনাশকেও জানাতে হবে | কী মুখ নিয়ে সে তাকে এই কথা বলবে? সাময়িক কান্নায় আবার ভেঙে পড়ে সে | বাকি দিনটা তার কেটে যায় দুঃখ, অভিমান ও কান্নার মধ্যে দিয়ে | রাতে অবিনাশের বুকে অনেকক্ষণ কেঁদে হালকা হয় সে |

ভীষণ বৃষ্টির মধ্যে পরদিন সকালে রচনার ঘুম ভাঙে | তার দুঃখে সমব্যথী হয়েই বোধহয় আকাশটা এত কাঁদছে | বিল্টুকে আজ school এ পাঠানো যাবে না | রান্নাঘরে breakfast বানাতে গিয়ে অবিনাশের ডাকে সে drawing room এ ছুটে আসে | Television এর পর্দায় breaking news টা তাকে হতভম্ব করে দেয় | কলকাতা হায়দ্রাবাদগামী ট্রেন ওড়িশাতে derailed হয়েছে | কমপক্ষে পঞ্চাশ জনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে | অসংখ্য মানুষ আহত | এই ট্রেন-এই তার মায়ের আসার কথা ছিল | শিহরিত হয়ে সে সোফায় ধপ করে বসে পড়ে | চোখ বুঝে হাতজোড় করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে | যে পায়রাটাকে কাল সারাদিন ধরে শাপসাপান্ত করেছে, তার জণ্য মা এতবড় বিপদের হাত থেকে বাঁচলো | অবলা প্রাণীর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মণ ভরে যায় | মায়ের প্রতি সব অভিমান নিমেষের মধ্যে উধাও হয়ে যায় | একটু ধাতস্ত হবার পর মাকে ফোন করে | মায়ের ক্রন্দনরত কন্ঠস্বর শুনে সে ভয় পেয়ে যায় | মায়ের এলোমেলো কথোপকথন থেকে সে জানতে পারে যে – কাল রাতে একজন প্রতিবেশী এসেছিলেন | তাই বসার ঘরের জানলাটা খোলা হয়েছিল | রাতে উনি সেটা বন্ধ করতে ভুলে যান | এই সুযোগে পাশের বাড়ির হুলো বেড়ালটা ঘরে ঢুকে পায়রাটাকে হত্যা করেছে | নিজেকে অপরাধী মণে করে পড়ে থাকা পালক্গুলোর পাশে বসে ভীষণ কাঁদছে তার মা |

Advertisements

15 thoughts on “পায়রা

  1. Khub bhalo laglo pore…..tobe ei pets er proti bhalobasar baparta sathe amar priyo bandhobir mayer posupremer sathe khub mil……..unio kintu pets der sob bhule jete paren……..tai golpota k bhison sotti mone holo…….chokher samne cinemar moto golpota bhaste laglo……tai bolchi golpota osadharon likhechish…….carry on…..expect more from you……

  2. golpo ta bhaloi hoyeche..kintu poru tai banga y hole aro bhalo lagto..atleast ‘words’ gulo bangla te likhle bhalo hoto..

  3. Tomar ei gun ta-r kotha jantam na to!! Appreciable hobby!! Sohoj, sorol pranjol bhashay lekha tai amar kaache more attractive. Golper content ta amar ei karone bhalo legeche je mone hoyeche chena porichito , rojkar jibon theke dekha ghotonar kahini roop,,,,,,,,,,

  4. Galpo lekha khub bhalo ovyesh …ghatonar prekkhapot chena, character chena, sudhu presentation ta alada..bhalo lagche, chaliye ja..

  5. Valo legeche. Gatanugotik galpo noi. Tobe keyekta banan vul / printing mistake dekhlam. Ar English worgs baybaharta kmate hobe.

  6. খুব ভালো লাগল । এমন গল্প আবার পড়তে চাই ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s