Traffic Signal

গাড়ীতে উঠে সীটে বসে সুনন্দা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল | আজ সে ভীষণ খুশি | তার অনেকদিনের সাধ আজ পূরণ হয়েছে | তার স্বামী রথীনের সাথে সে বেট লড়েছিল যে রথীন এই বছর তার কোম্পানিতে ডিরেক্টর হবে | রথীন এই পদোন্নতি একেবারেই প্রত্যাশা করে নি | তার থেকেও সিনিয়র কয়েকজন কোম্পানিতে আছেন | কিন্তু তা সত্বেও ম্যানেজিং ডিরেক্টর তাকেই এই পদে মনোনীত করেছে | বেতন বেড়েছে বেশ মোটা রকমের | সেই সঙ্গে কোম্পানির অংশীদারও হয়েছে সে | এই পদোন্নতিতে সুনন্দার অনেকটাই ভুমিকা আছে বলে সে মণে করে | MD ও তার স্ত্রীকে মাঝে মাঝেই বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে ভালোমন্দ রান্না করে খাওয়ানো, তাদের ছেলেকে প্রতিবার দামী উপহার দেওয়াটা এর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে | তাই সে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আজ সুনন্দাকে তার পছন্দমতো একটা দামী হীরের নেকলেস কিনে দিয়েছে |
কালো পার্সের এর ভিতর গয়নাটা আরেকবার দেখে নিয়ে সেটাকে পিছনে বসা তার মার হাতে দিয়ে বলল – “মা, এটাকে পিছনের ডেক-টাতে রেখে দাও আর রায়ানকে আমার কাছে দাও |”
রায়ান তাদের এক বছরের ছেলে | রায়ান কাছে আসতেই সে তাকে আদর করতে লাগলো | রথীন এসে গাড়ীটা চালাল​ | আজ অসম্ভব গরম পড়েছে, সঙ্গে গাড়ির AC-টা কদিন ধরে কাজ করছে না | অগত্যা দরজার কাঁচগুলো রথীন খুলে দিল | FM-টা চালিয়ে দিয়ে বাকি গাড়ীগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে সে বাড়ির উদেশ্যে রওনা দিল |
বড় রাস্তার সিগনালে গাড়িটা দাঁড়াতেই রায়ান ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে দিল | সুনন্দা কিছুক্ষণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তাকে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিল | একটা টিসু নিয়ে সে কপালের ঘাম মুছে নিল | রথীনের মোবাইলটা বেজে উঠেছে | সুনান্দার বাবার নম্বর দেখে সে ফোনটা সুনান্দাকে দিয়ে দিল |
“হ্যালো বাবা | কেমন আছো? —— আমরা ভালোই আছি, একটু বেরিয়েছি | —– মার সাথে কথা বলবে? এখুনি দিচ্ছি |”
ফোনটা সে তার মাকে দিয়ে দিল | ইতিমধ্যে তারা দেখল একটি আট-নয় বছরের ছেলে তার গায়ের গেন্জীটা খুলে তাদের গাড়ীর সামনেটা মুছতে শুরু করে দিয়েছে | কিছুক্ষণের মধ্যেই মোছা শেষ করে সে রথীনের দিকে আসার সময় পা পিছলে গাড়ীর side mirror টা ধাক্কা দিয়ে পড়ে গেল | রথীন রেগে চীত্কার করে উঠলো –
“ক্যায়া রে | দিখাই নেহি দেতা ক্যায়া ?”
ছেলেটি উঠে দাড়িয়ে বলল – “ফিসল গ্যয়া থা সাব । পাঁচ রুপিয়া দো না | খানা খানা হ্যায় ।”
রথীন রেগে উঠলো – “ভাগ ইহাসে । লিখাই পড়াই ছোড়কে আয়া হ্যায় ভিক্ মাঁগনে ।”
ছেলেটি আবার বলল – “দোনা ভাইয়া । বহুত ভুখ্ লাগা হ্যায় ।”
রথীন বলল – “ভাগ । টাইম ওয়েস্ট মত কর । ম্যায় এক পায়্সাভি নেহী দুঙ্গা ।”
ছেলেটি এবার​ সুনান্দার উদ্দেশে বলল – “দিদি । দো না ।”
সুনন্দা সঙ্গে সঙ্গে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল । এইরকম ঘটনা তাদের রোজকারের সঙ্গী । ছেলেটি কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে চলে গেল । সিগনালটা সবুজ হয়ে গেছে । গাড়িগুলো ধীরে ধীরে এগোতে সুরু করে দিয়েছে । মোড় থেকে বাম দিকে বাঁক নিয়ে একটু এগিয়ে রথীন বাস স্টপে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসকে হর্ন দিতে থাকলো ।
“দিদি -”
দরজার পাশের আচমকা ডাকে সুনন্দা তাকিয়ে দেখল সেই ছেলেটি একটা কালো পার্স হাতে নিয়ে দাড়িয়েছে । ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল – “ইয়ে আপকা ব্যাগ । বেবি রাস্তেমে ফেক দিয়া থা ।”
চকিতের মধ্যে সুনন্দা সেই পার্সটা ছেলেটির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পিছনে তার মার উপর রাগ করে বলল – “তুমি খেয়াল কর নি । ও কখন ফেলে দিয়েছে ।”
রথীন তাকে থামিয়ে বলল – “আগে দেখো, ওর মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা ! গয়না হাতিয়ে হয়তো ফাঁকা ব্যাগ ফেরত দিচ্ছে ।”
সুনন্দা ব্যাগ খুলে গয়নাটা দেখতে পেয়ে প্রাণ ফিরে পেল । বাকি জিনিস দেখে বলল – “সব ঠিক আছে । কিছু খোয়া যায়নি ।”
খুশি হয়ে ব্যাগ থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বার করে ছেলেটিকে দিতে গিয়ে দেখে ছেলেটি নেই । “কোথায় গেল ছেলেটা ?” সুনন্দা বলে ওঠে ।
আশে পাশে না দেখতে পেয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে ছেলেটি ব্যাগ ফেরত দিয়েই পিছনে দৌড় লাগিয়েছে । ওদিকের সিগনালটা আবার লাল হয়ে গেছে ।

Advertisements

7 thoughts on “Traffic Signal

  1. চেনা , যা অহরহ দেখে থাকি ; সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । সহজ সুন্দর ভাষায় ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s