পরিবর্তন

সন্ধ্যে ৭ টা। প্রতিদিনের মতো অচিন্ত্য ও ইলোরা বাড়ির ব্যলকনিতে বসে চা খাচ্ছে। সারাদিনের কাজের পর এটাই ওদের গল্প করার সময়। অচিন্ত্য একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে। ইলোরা একটি স্কুলে পড়ায়। দুজনের কাজের সময়ের তারতম্যের জন্য সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এই সময়টাতেই প্রথম একসাথে ওরা অনেকক্ষণ কাটাতে পারে। সারাদিনের কাজের পরে এই আড্ডাটা ওদের কাছে একটা নেশার মতো হয়ে গেছে। আজ একটু বৃষ্টি হচ্ছে। আদা মেশানো চা এই বাদলার দিনে বেশ ভাল লাগছে দুজনের। ঘরের ভিতর বিছানায় রাখা মোবাইলটা বেজে উঠতে ইলোরা ফোনটা রিসিভ করতে উঠে গেল। অচিন্ত্য চায়ে চুমুক দিতে দিতে ব্যলকনি থেকে দৃশ্যমান রাস্তার দিকে চোখ নিবন্ধ করল।

প্রায় দশ মিনিট পর ইলোরা ফিরে এলো। এক চুমুকে কাপে পড়ে থাকা বাকী চা শেষ করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আপনমনে হাসতে থাকল। অচিন্ত্য কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল – “কে ফোন করেছিল? ফোন রাখার পর থেকে হেসেই যাচ্ছ দেখছি।“

ইলোরা – “তুমি চিনবে না। অন্তরাদি ফোন করেছিল। অন্তরাদি আমাদের স্কুলে পার্ট টাইম টিচার ছিল। ক্লাস টেন-এ আমাদের জিওগ্রাফি পড়াত। খুব ফ্রেন্ডলি ছিল। কদিন আগেই ফেসবুকে খুঁজে পেলাম। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতেই ফোন নাম্বার চেয়ে পাঠালেন। প্রায় ৭ বছর পর কথা বললাম অন্তরাদির সাথে।“

অচিন্ত্য – “ওঃ, আচ্ছা।“

কিছুক্ষণ থেমে ইলোরা বলল – “তুমি ভবিতব্য বিশ্বাস কর?”

অচিন্ত্য – “হঠাৎ, এই প্রশ্ন করছ?”

ইলোরা – “বলই না।”

অচিন্ত্য – “না। এই রকম কিছু হয় না।“

ইলোরা – “তাহলে Marriages are made in heaven কথাটাও বিশ্বাস কর না?”

অচিন্ত্য – “না। এগুলো ফালতু কথা। তুমি বিশ্বাস কর নাকি?”

ইলোরা – “সত্যি বলতে বিশ্বাস করতাম না। তবে ফোন কলটার পর মনে হয় সত্যি হলেও হতে পারে।“

অচিন্ত্য (হেসে) – “অন্তরাদি তোমাকে কী এমন বলল যে তোমার বিশ্বাস বদলে গেল?”

ইলোরা – “অন্তরাদি একটা পুরানো ঘটনা মনে করিয়ে দিল। ঘটনাটা আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। সত্যিই কী অদ্ভুত।“

অচিন্ত্য – “কী রকম ঘটনা?”

ইলোরা – “তখন সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে। রেজাল্ট বেরোতে অনেকদিন বাকী। এর মধ্যে প্রেগন্যান্ট হওয়ার জন্য অন্তরাদি চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। অন্তরাদির বাড়ী ছিল আমার পুরানো বন্ধু সায়নীর বাড়ীর কাছে। একদিন সায়নী আমাকে ফোনে জানাল অন্তরাদির সাথে ওর দেখা হয়েছিল। অন্তরাদি গল্প করার জন্য আমাদের ডেকেছে। সারাদিন বাড়ীতে বসে বোর হতাম। তাই একদিন অন্তরাদির বাড়ী গিয়ে হাজির হলাম কয়েকজন বন্ধু। অন্তরাদি বেশ আপ্যায়ন করল। আমরাও গল্পগুজবে মশগুল হয়ে পড়লাম। বিকেল হতে জলখাবার এলো। আমরা সেগুলো তখন খেতে ব্যস্ত, হঠাৎ অন্তরাদির কথা শুনে চমকে গেলাম। ‘ইলোরা, ঘরটা ভাল করে ঝাঁট দিয়ে দাও। বড্ড নোংরা হয়েছে।‘ আমার সাথে বন্ধুরাও অবাক হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে এক যুবতী হাতে ঝাঁটা নিয়ে ঘরে ঢুকল। সেই দেখে বন্ধুরা হো হো করে হাসতে শুরু করে দিল। অন্তরাদি কিছুক্ষণ পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হাসতে থাকল। আমার ভীষণ প্রেস্টিজে লেগেছিল। আমি একটু বিরক্ত হয়েই কাজের মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম – ‘তোমার নাম কী?’ উত্তর এলো – ‘ইলোরা মাইতি।‘ মেয়েটি ঘর থেকে বেরোনোর পর আমি বললাম – ‘যাক বাবা, আমার সারনেম ব্যানার্জি। এইসব মাইতি-ফাইতি সারনেম কাজের লোকদেরই মানায়।‘”

অচিন্ত্য ইতিমধ্যে হো হো করে হাসছে। সেই দেখে ইলোরাও হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে বলল – “তারপর থেকে অন্তরাদির বাড়ী গেলেই বন্ধুরা এই নিয়ে খেপাত। আমি খুব রেগে যেতাম। সত্যিই কী বোকা ছিলাম তখন।“

অচিন্ত্য হাসি থামিয়ে বলল – “আচ্ছা, এই কারণে তুমি ভবিতব্য নিয়ে বলছিলে?”

ইলোরা – “তাহলে বল, ভবিতব্য নয়। আমি গর্ব করে সেদিন সারনেমটার অপমান করেছিলাম, আর দেখ, ভালবাসা হল তো হল সেই তোমার সাথে আর বিয়ের পরে আমার নাম হয়ে গেল ইলোরা মাইতি। একে ভবিতব্য ছাড়া আর কি বলবে?”

অচিন্ত্য – “তা বিয়ের পর সারনেম চেঞ্জ করলে কেন? পুরানো নামটাইতো রাখতে পারতে। কোন অসুবিধাই তো হত না।“

ইলোরা – “সারনেম চেঞ্জের সিদ্ধান্তটা অনেক ভেবেচিন্তেই নিয়েছিলাম। তোমার সম্বন্ধে বলার পর বাড়ীতে সবার যা রিয়াক্সান দেখেছিলাম – তা খুবই দুঃখজনক ছিল। ছোট মেয়ে বলে বাড়ীর লাডলী ছিলাম,  রাতারাতি যেন স্ট্রেঞ্জার হয়ে গেলাম। রাতদিন ধরে বাড়ীর লোকজন বোঝাতে শুরু করলো অব্রাহ্মণে বিয়ে করলে বংশ মর্যাদা যাবে। আত্মীয়স্বজনরা হাসাহাসি করবে। অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কেউ একচুলও নড়ল না সিদ্ধান্ত থেকে। বাধ্য হয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে বিয়ে করতে হল। পরিবারের এই গোঁড়ামি, জাতপাত, সংকীর্ণতা মন থেকে মেনে নিতে পারি নি। তাই ওই পরিবারের সারনেম ত্যাগ করাই আমার কাছে উচিত বলে মনে হয়েছিল। আমার বিশ্বাস আমি কোন ভুল করি নি। আমি এখন ভাবতে পারি না একবিংশ শতাব্দীতে থেকেও লোকজন জাতপাত নিয়ে এইরকম fuss করে।“

অচিন্ত্য – “সারাদেশেইতো জাতপাত এখনো আছে। প্রকৃত শিক্ষার অভাবের জন্য এই সমস্যার সমাধান নেই।“

ইলোরা – “তোমার কি মনে হয় আমার বাবা-মা বা পরিবারের বাকিরা অশিক্ষিত ! শিক্ষা মানুষকে উচিত অনুচিত সম্বন্ধে বলে। কিন্তু একমাত্র ভালবাসাই পারে এই ভেদাভেদ দূর করতে।“

অচিন্ত্য –“তোমার কথাটা একদম ঠিক, ম্যাডাম।“

দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অচিন্ত্য হেসে বলল – “তবে ঘটনাটা বলে ভালই করেছ। তোমার এই চিন্তাভাবনার পরিবর্তনে আমি খুব খুশি। তোমার সারনেম এখন যখন কাজের লোকদের মতো – তখন বাড়ীর কাজের মেয়েটাকে ছাড়িয়ে দাও, আর তুমি ওর সবকাজ কর।“

ইলোরা একটু থেমে বলল – “বাড়ীর কাজের লোক হতে আমার কোন অসুবিধাই নেই। তবে মনে রেখো, সেটা হলে রাতের অনেক কিছু অ্যাক্টিভিটি বন্ধ হয়ে যাবে, কারণ সেটা কাজের লোকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।“

গল্পটির প্রথম প্রকাশ অনলাইন ম্যাগাজিন Hatpakha তে – http://hatpakha.com/poribortan/

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s