পূজা পরিক্রমা

মন্তব্য: উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশ কোলাজ পূজাবার্ষিকী ১৪২১ (সম্পাদিত সংস্করণ)।

পাঠকদের সুবিধার জন্য অধ্যায়গুলির লিঙ্ক নিচে দেওয়া হল।

অধ্যায়                           ১০   ১১   ১২   কোলাজ সংস্করণ

1মহাসপ্তমীর রাত। সপ্তমীর পূজা চলছে পুরোদমে। ঢাকিরা মহানন্দে ঢাক পিটিয়ে চলেছে। কাঁসরের শব্দের সঙ্গে ঢাকের আওয়াজ দুর্গাপূজার মাদকতা এনে দিচ্ছে বাতাসে। বাঙালীর অতি প্রিয় এই ধ্বনি। কিন্তু এই সুমধুর শব্দ যেন কর্কশ লাগছে অনির্বাণের। রাস্তায় মানুষের ঢল বের হলেও সে বাড়ীতে অন্ধকার করে একা বসে আছে। তার মাথা বন বন করছে রাগে। সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলেছে রাগের তীব্রতা। হাত দিয়ে দু কানটা যথাসম্ভব চেপে ধরল সে। কী নিষ্ঠুর এই শব্দটা তার কাছে। আগের বছর সে কলকাতার বাইরে ছিল, তাই অসুবিধা হয় নি। কিন্তু এবার বাধ্যতামূলক থাকতে হয়েছে অফিসের কাজে।

ঢাকিদের উন্মাদনা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সেই সঙ্গে বেড়ে চলেছে ঢাকের লয় ও শব্দ। হাতও সেই শব্দকে আটকে রাখতে পারছে না। অসহ্য হয়ে উঠছে তার বাড়ীতে থাকা। সে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। কিছুদূর যেতেই একটা ট্যাক্সি ফাঁকা পেয়ে তাতে উঠে বসল সে।

“কোথায় যাবেন?” – ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল।
অনির্বাণ- “আলো আওয়াজ নেই এই রকম কোন জায়গায় নিয়ে চল।“
ড্রাইভার- “পুজোর দিনে কলকাতায় আলো আওয়াজ ছাড়া জায়গা কোথায় পাবেন?“
অনির্বাণ- “তোমরা তো অনেক রাস্তা চেন, তোমরা নিশ্চয় জানো এই পুজোর দিনে কোথায় শান্ত, নিরিবিলি জায়গা পাওয়া যাবে।“
ড্রাইভার- “আপনিতো বড় মুশকিলে ফেললেন! এই মার্কেটে নিরিবিলি জায়গা!”

স্টিয়ারিং-এর উপর হাতটা রেখে ড্রাইভার ভাবতে থাকল। তারপর বলল- “বাবুঘাট যাবেন? গঙ্গার পাশে শোরগোল কম হবে।“
অনির্বাণ- “তাই চল।“

55683865স্টার্ট দিয়ে ট্যাক্সি মন্থর গতিতে জ্যামের মধ্যে দিয়ে বাবুঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হল। পৌঁছতে লেগে গেল প্রায় এক ঘণ্টা। মৃদু মন্দ বাতাস বইছে গঙ্গার পাড়ে। আওয়াজ অনেক কম। একটু দূরে কিছু মানুষের কলরব শোনা যাচ্ছে। তবে তা অনির্বাণের কোন অসুবিধার কারণ হয়ে উঠছে না। পাড়ে লাগানো নৌকাগুলি দুলে চলেছে। সেই দিকে তাকিয়ে মনটা সাময়িক শান্তি পেল। ঘাটের পাশে ছাতযুক্ত বাঁধানো বসার জায়গাটায় গিয়ে বসল সে। একদৃষ্টে সে সুদূরে আলোকিত রবীন্দ্র সেতুর দিকে তাকিয়ে থাকল। ধীরে ধীরে আলোগুলি আবছা হয়ে গেল। সে ফিরে গেল দুই বছর আগের মহাসপ্তমীর সন্ধ্যেটাতে।

অনির্বাণদের বাড়ীর পাশের মাঠটাতে প্যান্ডেল বেঁধে দুর্গা পূজা চলছে। এই পুজোটা অনেকাংশে ওদের বাড়ীর পুজো বলা চলে। ওর বাবা মা দুজনেই মা-দুর্গার ভীষণ ভক্ত। আগে প্রতিবছর ওদের বাড়ীতেই দুর্গাপূজা হত। কয়েকবছর হল প্রতিবেশীদের অনুরোধে বাড়ীর পুজোটা পাড়ার পুজোতে পরিণত হয়েছে। পুজোটাও বড় আকার ধারণ করেছে। অনির্বাণের বাবাই এই পুজোর প্রধান। তিনি নিজেই পুজোটা করেন। অনির্বাণের মা তাকে সাহায্য করেন। সেবারও এর ব্যতিক্রম হয় নি।

সপ্তমীর সন্ধ্যের পুজো শুরু হয়ে গেছে। অনির্বাণ একটা চেয়ারে বসে পুজো দেখছে। তার মা মাঝে মাঝে তাকে ডেকে নিচ্ছেন সাহায্যের জন্য। তার বাবা দুর্গা আরাধনায় ব্যস্ত। অনির্বাণের পকেটের মোবাইলটা বেজে উঠল। ফোন করেছে তার পাড়ার বন্ধু সুনীল।

অনির্বাণ- “হ্যাঁ, সুনীল বল!”
সুনীল- “তোকে একটু চাপে পড়ে ফোন করলাম। ভীষণ দরকার, এখনই একবার আসতে পারবি?”
অনির্বাণ- “পুজো শুরু হয়ে গেছে, এখন যাব কি করে?”
সুনীল- “কাউকে একটা দায়িত্ব দিয়ে চলে আয় না, ভীষণ জরুরী।“
অনির্বাণ- “কী হয়েছে?”
সুনীল- “তুই স্কুলের পাশের গলিটায় চলে আয়, তারপর বলব।“
অনির্বাণ- “কী ঝামেলা, পুজো শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবি না?”
সুনীল- “পারলে তোকে এখনই আসতে বলতাম? দেখ না বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। পুজো শেষের আগেই পৌঁছে যাবি।“
অনির্বাণ- “আচ্ছা, দেখছি।“
সুনীল- “দেখিস না, তাড়াতাড়ি আয়।“

সুনীল বাজে কথার ছেলে নয়। জরুরী কিছু না হলে সে ফোন করত না। অনির্বাণ তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল- “তোমার আর কিছু লাগবে? আমায় একটু বেরোতে হবে।“
অনির্বাণের মা- “কোথায় যাবি?”
অনির্বাণ- “স্কুলের কাছটায় যাব। পুজো শেষের আগেই ফিরে আসব।“
অনির্বাণের মা- “আচ্ছা যা। কিছু দরকার হলে কাউকে ডেকে নেব।“

স্কুলের পাশের গলিতে পৌঁছে সে দেখল তার আরেক বন্ধু শিশিরকে নিয়ে সুনীল একটা বাড়ীর সামনের বসার জায়গায় বসে আছে। শিশিরের চোখ বন্ধ। সুনীল তাকে দেখেই বলল- “এসে গেছিস, ভাল হয়েছে।“
অনির্বাণ- “ওর কী হয়েছে?”
সুনীল- “কী আর বলব! গার্লফ্রেন্ডের দুঃখে বাবু একা মাল খেতে গিয়েছিল। ফোনে কথা বলে বুঝতে পারি অবস্থা ভাল নয়। পৌঁছে দেখি খেয়ে একদম আউট। বিল মিটিয়ে ধরে ধরে নিয়ে আসছিলাম, বমি করল। এখন এখানে বসে আছে। কোনোভাবে তুলতে পারছি না। তুই একটু হেল্প কর ওকে আমার বাড়ী নিয়ে যেতে।“
অনির্বাণ শিশিরের উদ্দেশ্যে বলল- “অ্যাই ওঠ, চল বাড়ী চল।“

শিশিরের কোন হুঁশ নেই। দুজনে মিলে ওকে ধরে রাস্তা দিয়ে নিয়ে চলল। সুনীলের বাড়ী অনির্বাণের বাড়ীর কাছেই। পাড়ার কাছে আসতেই দুজনে লক্ষ্য করল লোকজন ভীষণ ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। বালতি করে টাইমকলের জল নিয়েই দৌড়চ্ছে মাঠটার দিকে। কালো ধোঁয়ার গন্ধ ওরা নাকে পেল। দুজনেই শিশিরকে একটা বাড়ীর সামনে রেখে দৌড়ল পুজো প্যান্ডেলের দিকে।

fire_kumbh_-b-_25-01-2013কাছে পৌঁছতেই দেখল প্যান্ডেলে আগুন লেগেছে। প্রায় পুরোটাই পুড়ে গেছে। আগুন এত তীব্র আকার ধারণ করেছে যে তাকে থামানো যাচ্ছে না। লোকজন বালতি করে জল দিয়ে আগুন প্রশমিত করার চেষ্টা করছে। একজনকে দেখে অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল- “আমার বাবা-মাকে দেখেছ? পুজো করছিল।“

সে বলল- “আমি জানি না রে। আমি এসে দেখি আগুন লেগে গেছে। তুই একটু এদিক ওদিক দেখ।“

অনির্বাণ ও সুনীল ভিড়ের মধ্যে খোঁজার চেষ্টা করল। কিন্তু কোথাও তাদের হদিশ পাওয়া গেল না। একজন জানালেন- “ওরা ভিতরেই আটকে পড়েছেন। ওদের বেরোতে তো দেখি নি।“

সর্বনাশ, এই ভয়ঙ্কর আগুনের মধ্যে ওদের কী করে বার করবে অনির্বাণ? সে চীৎকার করে বাবা-মার হদিশ পাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ওদের কোন সাড়া পাওয়া গেল না। ইতিমধ্যে দমকল চলে এসেছে। তারা হোশ পাইপে করে জল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করে দিল। আধঘণ্টার মধ্যে আগুন কন্ট্রোলের মধ্যে চলে এলো। দেখা গেল, অনির্বাণের বাবা-মা অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছেন। এ্যাম্বুলেন্সে করে তৎক্ষণাৎ তাদের পাশের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। তখনও তাদের নিঃশ্বাস চলছে। কিন্তু রাতের মধ্যেই তারা দুজনে অনির্বাণকে একা ছেড়ে এক নতুন জগতে পাড়ি দিলেন।

hand-on-shoulderচোখ দুটো জলে ভরে গেছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মনের মধ্যে। আওয়াজ করে কেঁদে ভেঙে পড়ল অনির্বাণ। দু বছর আগের সর্বনেশে ঘটনা তার জীবন এখনও তাড়া করে চলেছে।

“কী হয়েছে? এত কাঁদছ কেন?”- একটি নারী কণ্ঠস্বর খুব কাছ থেকে এলো। চেষ্টা করেও কান্না থামাতে পারল না সে। একটি মেয়েলী হাত তার কাঁধ স্পর্শ করল। নারী কণ্ঠস্বরে আবার প্রশ্ন এলো- “ভীষণ কষ্ট হচ্ছে বুঝি। প্লীজ কান্না থামাও। এই রুমালটা নাও, চোখ মোছ।“

রুমালটা দেখতে পেলেও সে হাত দিয়েই দুই চোখ মুছল। নিজেকে অনেকটাই সামলে নিতে পেরেছে সে এখন।

“বেটার লাগছে?”– আবার নারী কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন এলো।

অনির্বাণ এবার উপরে তাকাল। দেখল একটি বাইশ-তেইশ বছরের যুবতী মেয়ে তাকে এতক্ষণ সান্ত্বনা দিচ্ছিল। সে একটু হাঁসার চেষ্টা করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

“একটু চা খাবে? মনটা ভাল লাগবে। দাঁড়াও আমি চা আনছি।”- মেয়েটি এগিয়ে গেল। অনির্বাণ তাকে বারণ করার চেষ্টা করতে গেল, কিন্তু মুখ থেকে কোন শব্দ বের হল না। কাছের রাস্তায় বসা চাওয়ালার কাছ থেকে সাদা কাগজের কাপে দুটো চা এনে অনির্বাণের পাশে বসল মেয়েটি।

চা-টা বেশ খেতে। মনটা একটু ভাল হল অনির্বাণের। মেয়েটি চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল- “কী হয়েছে? এই রকমভাবে ভেঙে পড়েছিলে কেন? পুজোর দিন বউয়ের সাথে ঝগড়া করে বেরিয়েছ নাকি?”

দুঃখের মধ্যেও মেয়েটির কথা শুনে হাসি পেয়ে গেল অনির্বাণের। সে বলল- “না, আমার বিয়ে হয় নি।“
মেয়েটি- “তাহলে গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে ঝগড়া করা হয়েছে বুঝি পুজোর দিনে?”
অনির্বাণ- “না, আমার কোন গার্লফ্রেন্ড নেই।“
মেয়েটি- “তাহলে কি বাবা-মার কিছু হয়েছে?”

বাবা-মার কথা শুনে অনির্বাণের হাসি মিলিয়ে গেল। আবার গম্ভীর হয়ে গেল সে। মেয়েটি উত্তর না পেয়ে আবার জিজ্ঞেস করল- “ওরা সবাই ভাল আছেন তো?”

অনির্বাণ উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। মনে পড়ে গেল হাসপাতালে দেখা তার বাবা-মায়ের দগ্ধ মুখ, ডাক্তারদের মুখের কথা – পেশেন্ট এক্সপায়ার করে গেছে।

মেয়েটি- “আচ্ছা বুঝেছি, ওদের ভয়ঙ্কর কিছু বিপদ হয়েছে, ঠিক তো?”

অনির্বাণের চোখে আবার জল চলে এলো। সে হাতটা দিয়ে চোখটা ঢেকে কান্না আড়াল করল।

মেয়েটি- “দেখ, চুপ করে থাকলে তো তোমার দুঃখ মিটবে না। আর মনের মধ্যে কষ্টটা চেপে রাখলে সেটা আরও বাড়বে। আমি তোমার কাছে স্ট্রেঞ্জার। তোমার হয়ত আমাকে বলতে দ্বিধা থাকতে পারে। তবে আমি রিকোয়েস্ট করব নিজের কোন বন্ধুকে তোমার কষ্টটা শেয়ার কর। যতদিন এটা চেপে রাখবে এটা ততদিন কষ্ট দেবে। শেয়ার করলে দেখবে কষ্টটা কম হবে। আমি ডাক্তার নই, তবে সাইকোলজির স্টুডেন্ট ছিলাম। সেই সূত্র ধরেই আমি এত কথা বললাম। কথাগুলো পছন্দ না হলে সরি।“

কথাগুলি বলে মেয়েটি চায়ে মননিবেশ করল। অনির্বাণ চুপচাপ বসে রইল। মেয়েটি চা শেষ করে উঠে পড়ল- “তোমার হয়ত একা থাকতে ইচ্ছে করছে, আমি উঠছি।“

মেয়েটির কথাগুলো নিয়ে ভাবছিল অনির্বাণ। কোন ভুল তো সে বলছে না। দু বছর ধরে সে এই ব্যথা বয়ে চলেছে। একটুখানিও তো তার মাত্রা কমে নি। কিন্তু, কথা বলতে দ্বিধা হচ্ছিল তার। মেয়েটির উত্থান সেই সংকোচ ভেঙে দিল।

অনির্বাণ- “আমার বাবা-মা দুজনেই দুই বছর আগে সপ্তমীর দিন মারা গেছেন।“
মেয়েটি বসে পড়ল- “সে কী! কী বলছ! দুজনেই একদিনে মারা গেছেন? ভেরি স্ট্রেঞ্জ।“
অনির্বাণ- “হ্যাঁ, ন্যাচারাল ডেথ নয়। দুজনে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন।“
মেয়েটি- “কী ভয়ঙ্কর!”
অনির্বাণ বলে চলল- “আমি ওদের পুড়ে যেতে দেখলাম, কিছুই করতে পারলাম না। একমাত্র সন্তান হয়ে কোন দায়িত্ব পালন করতে পারলাম না। হতভাগা সুনীল যদি ডেকে না নিয়ে যেত, আমি ওদের বাঁচাতে পারতাম। সুনীলও কম দায়ী নয় এই মিসহ্যাপের জন্য।“
মেয়েটি- “আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিছু মনে না করলে একটু খুলে বলবে কী হয়েছিল?”

অনির্বাণ ধীরে ধীরে মেয়েটিকে সেই অভিশপ্ত দিনের কথা বলল। মেয়েটি সব শুনে স্তব্ধ হয়ে রইল।

অনির্বাণ বলে চলল- “বাবা-মা দুজনেই দুর্গার ভীষণ ভক্ত ছিলেন। কী ভীষণ বিশ্বাস করতেন মা-দুর্গাকে। অথচ তার সামনেই দুজনে শেষ হয়ে গেল, ভক্তদের বাঁচানোর কোন চেষ্টাই ঠাকুর করল না। আর সুনীলটাও যদি সেদিন ঘ্যান ঘ্যান করে না ডাকত তাহলে আমি আজ অনাথ হয়ে যেতাম না।“

অনির্বাণের মর্মান্তিক ঘটনা শুনে মেয়েটির গলা ধরে গিয়েছিল। সে স্বরটা টেনে নিয়ে বলল- “দেখ, তোমার সাথে যা ঘটেছে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু, তুমি যে নিজেকে দোষারোপ করছ, তোমার তো ওখানে কিছু করার ছিল না। এটা ঠিক, তুমি ওখানে থাকলে এই রকম কিছু হত না। তবে তুমি ভবিষ্যৎ জানবে কী করে? সবাই যদি নিজেদের ভবিষ্যৎ জানত তাহলে তো পৃথিবীতে কোন দুঃখ কষ্ট থাকত না। যে জিনিস তোমার কন্ট্রোলের বাইরে, সেখানে নিজেকে দোষারোপ করে কষ্ট পাওয়ার কোন মানে হয় না। আর তোমার চেষ্টা করার আগেই তো সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। এটাকে কপালের দোষ ছাড়া আর কী বলবে। বেচারি সুনীলকেও কোন দোষ দেওয়া যায় না। ও সমস্যায় পড়েছিল বলেই তো তোমার সাহায্য চেয়েছিল। ওর জায়গায় তুমি হলে কী করতে সেটা ভেবে দেখ। বরং গিল্টি ফিলিং তোমার থেকে বেশি হবার সম্ভাবনা ওরই। ওর পক্ষে স্বাভাবিক নিজেকে এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মনে করা। ও নিশ্চয়ই তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল।“

অনির্বাণ- “হ্যাঁ, অনেকবারই ও বলেছে এই কথা।“
মেয়েটি- “তাহলে ভাব, ওর বিবেক দংশন কি তোমার থেকে কম? আর দেখ বাবা-মা তো চিরকাল আমাদের সাথে থাকেন না। একদিন না একদিন তো তাদের হারাতে হয়। আমিও পাঁচ বছর বয়েসে মাকে হারিয়েছি। তাই তোমার কষ্টটা বুঝতে পারি। এই ঘটনাগুলি থেকে রিকভার করা কঠিন। কিন্তু, মন শক্ত করা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই। অ্যাকসেপ্ট করে জীবনে এগিয়ে যে চলতেই হবে। ন্যাচারাল ডিজাস্টার, দাঙ্গা-হাঙ্গামায় কত ছোট ছোট বাচ্চারা তাদের বাবা মা হারায়। তারা কত অসহায়, তাদেরকে তো এই শোক ভুলতে হয়। তারা যদি পারে তুমি কেন পারবে না?”

মেয়েটিকে বলতে পেরে ও মেয়েটির কথা শুনে অনির্বাণ উজ্জীবিত হল। মনটা বেশ ভাল লাগছে তার। সে বলল- “আরেকবার চা চলবে?”
মেয়েটি- “না, চা খেতে আর ইচ্ছে করছে না। তবে তুমি খেতে পার।“
অনির্বাণ- “আমার না হলেও চলবে। তবে তুমি চা খাওয়ালে, আমারও কিছু খাওয়ান উচিৎ।“
মেয়েটি হেসে বলল- “ভারি তো পাঁচ টাকার চা। এর কোন দরকার নেই।“

মেয়েটি হাসলে বেশ সুন্দর দেখায়। সেই হাসির দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ একটু আনমনা হয়ে পড়ল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সংযত হয়ে বলল- “না, তা কিছুতেই হয় না। তুমি একজন অচেনা হয়েও আমাকে যা হেল্প করলে তা কেউ করে নি। প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। তবু তোমার জন্য যদি কিছু করতে পারতাম। মনটা ভাল লাগত।“

মেয়েটি খিল খিল করে হেসে ফেলল- “এমন কিছুও করি নি যে প্রতিদানের কথা আসতে পারে। প্লীজ আমাকে এম্ব্যারাস করো না। কোন কিছুর দরকার নেই।“
অনির্বাণ নাছোড়বান্দা- “প্লীজ, আমাকে এইরকমভাবে ঋণী রেখ না। চা না হোক অন্য কিছু খাও। এখানে আর কী পাওয়া যায় তা যদিও জানি না।“
মেয়েটি- “আচ্ছা ঠিক আছে, এখানে একটা ফুচকাওয়ালা বসে, বেশ ভাল বানায়। ফুচকা খেতে পারি।“
অনির্বাণ- “বেশ, তাই চল।”

ওরা দুজনে ঘাট থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশ ধরে হেঁটে চলল। আলোতে মেয়েটিকে প্রথমবার দেখল অনির্বাণ। লম্বা, ফর্সা, সুন্দরী, তবে পরিচর্যার অভাব। পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, কাঁধে একটা সাদা ব্যাগ ও পায়ে সাদা চপ্পল। গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেখল ফুচকাওয়ালা নেই।

মেয়েটি বলল- “না, আজ বসে নি।“
অনির্বাণ- “আর কোন ফুচকাওয়ালা বসে না?”
মেয়েটি- “পুজোর দিনে এখানে ওদের পাওয়া যাবে না। এই চারদিন প্যান্ডেলেই ওদের বিক্রি বেশি হবে।“
অনির্বাণ- “তাহলে চল কাছাকাছি কোন প্যান্ডেলে যাই।“
মেয়েটি- “কাছাকাছি কোন পুজোর প্যান্ডেল আছে বলে আমি জানি না। থাকলে সেটা অনেক দূর। কোনভাবেই অতটা হাঁটা সম্ভব নয়।“
অনির্বাণ- “তাহলে চল, ট্যাক্সি করে যাই।“
মেয়েটি অবাক হয়ে বলল- “সামান্য কটা টাকার ফুচকা খাওয়ার জন্য ট্যাক্সি করে যাবে?”
অনির্বাণ- “এখানে তো আর কোন ট্রান্সপোর্ট দেখছি না। বাড়ী ফিরতে হলে তো ট্যাক্সি লাগবেই।“
মেয়েটি- “সেটা যদিও ঠিকই বলেছ। কিন্তু, এটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।“
অনির্বাণ- “তেমন কিছুও হচ্ছে না।“

DSC01868কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। দুজনে চড়ে বসল। ঠিক হল ভবানীপুরের নর্দার্ন পার্কের দিকে তারা যাবে। গঙ্গার পাশ ধরে ট্যাক্সি এগিয়ে চলল। অনির্বাণ একটু ইতস্তত হয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল- “কিছু যদি মনে না কর, তোমার নামটা জানতে পারি?”

মেয়েটি আবার হেসে ফেলল- “এই দেখ, এতক্ষণ আমরা কথা বলছি, কিন্তু নাম জানাই হয় নি। আমার নাম মনালী। আর তোমার?”
অনির্বাণ- “আমি অনির্বাণ। নাইস টু মিট ইয়ু।“
মনালী- “সেম হিয়ার।“
অনির্বাণ- “আরও একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?”
মনালী- “হ্যাঁ বল।“
অনির্বাণ- “একটু পার্সোনাল প্রশ্ন, আউট অফ কিউরিওসিটি জানতে চাইছি।“
মনালী- “আচ্ছা বেশ, বেশি পার্সোনাল হলে উত্তর দেব না কিন্তু।“
অনির্বাণ- “সপ্তমীর দিন তুমি একা ঘুরে বেড়াচ্ছ। তোমার ফ্যামিলি বা বন্ধুদের সাথে নয় কেন?”
মনালী শুকনো হেসে বলল- “বাবা-মা-ভাই শহরে নেই। আর বন্ধুরা নিশ্চয়ই তাদের বয়ফ্রেন্ডদের সাথে ঘুরছে।“
অনির্বাণ- “তা তুমি তোমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরছ না কেন?”
মনালী- “তোমার কি মনে হয়, আমার বয়ফ্রেন্ড থাকলে আমি আজ একা ঘুরে বেড়াতাম?”
অনির্বাণ- “হ্যাঁ, সেটা ঠিক।“

মনালী বাইরের দিকে মননিবেশ করল কিন্তু পরক্ষণেই অনির্বাণের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল- “তবে, অ্যাই মাস্ট সে, ইয়ু আর ভেরি স্মার্ট। মেয়ের সাথে প্রথম আলাপেই তার বয়ফ্রেন্ড আছে কিনা জিজ্ঞাসা করে নিলে।“

অনির্বাণ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল-“এ বাবা, না না, এই রকম কোন উদ্দেশ্যই আমার ছিল না।“

মনালী খিল খিল করে হেসে উঠল। অনির্বাণ মাথা নিচু করে বলল- “প্লীজ হেসো না। অ্যাই আম ফিলিং এম্ব্যারাসড।”

মনালী হাসি থামাল। বলল- “ওকে, চল হাসি থামালাম।“

কিন্তু মুহূর্তখানেক পরেই অনির্বাণকে দেখে আবার হেসে ফেলল। অনির্বাণ আর কিছু না বলে জানালার বাইরে দেখতে থাকল।

নর্দার্ন পার্কে পৌঁছতে লেগে গেল বেশ অনেকখানি সময়। ট্যাক্সির জন্য নয়, দর্শনার্থীদের ভিড়ে। প্রতিমা দেখে বেরিয়ে এক ফুচকাওয়ালাকে পেয়ে গেল তারা। মনালী শালপাতার বাটিটা হাতে নিয়ে অনির্বাণকে জিজ্ঞাসা করল- “তুমি কি ঝাল খেতে ভালবাস?”

অনির্বাণ- “তা ঝাল চলতে পারে।“
মনালী- “আমি কিন্তু ভীষণ ঝাল খেতে ভালবাসি।“
অনির্বাণ- “তাতে কোন অসুবিধা নেই। আমি তো বাইরে খাওয়া দাওয়া করি, ঝাল খাওয়ার অভ্যাস আছে।“

মনালী ফুচকাওয়ালাকে বেশি ঝাল দিতে বলল। ফুচকাওয়ালা অনেকটা কাঁচা লঙ্কা আলুর সাথে মেখে ওদের জন্য আলাদা করে রাখল। পরিবেশন করা শুরু করে মনালীর কাছ থেকে ঝাল ঠিক আছে কিনা জেনে নিল ফুচকাওয়ালাটা।

DSC_8701জল সমেত প্রথম ফুচকাটা মুখে পুরেই অনির্বাণ বুঝতে পারল এইরকম ঝাল সে কখনও খায় নি। মাথাটা ঝন ঝন করে উঠল। দ্বিতীয়টা খাওয়ার পর তার তীব্রতা আরও বাড়ল। টেস্ট বাডগুলো যেন পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু মনালীকে সে বড় মুখে বলেছে ঝাল সে খেতে পারবে। তৃতীয়টা কোন রকমে গলাধঃকরণ করল সে। কিন্তু চতুর্থটা খেতে গিয়ে চোখ থেকে জল বেরিয়ে এলো। মনালী লক্ষ্য করে বলল- “এ কী, চোখে জল চলে এল তো।“

অনির্বাণ ইশারা করে জানাল সে এত ঝাল আর খেতে পারছে না। মনালী ফুচকাওয়ালাকে ঝাল ছাড়া ফুচকা দিতে বলল। বাকী কটা খেতে তার অসুবিধা হল না। কিন্তু ঝালের স্বাদ যেন কমল না। মনালী দৌড়ে গিয়ে একটা জলের বোতল কিনে এনে তার হাতে দিল। অনির্বাণ ঢক ঢক করে অনেকটা জল খেয়ে নিয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেল। মনালী মুখটা একটু কাঁচুমাচু করে বলল- “ইস, আমার জন্য তোমার এই অবস্থা হল। সরি, ভীষণ খারাপ লাগছে।“

অনির্বাণ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল- “সরি বলার কিছু নেই। আমিই তো বললাম আমি পারব ঝাল খেতে। তুমি বুঝবে কী করে!”
মনালী- “তবুও, আমার জন্যই তো হল। একটা কাজ কর। চিকলেট খেয়ে নাও। বেটার লাগবে।“
অনির্বাণ- “ঝাল কমবে বলছ। আশে পাশে তো দোকান দেখছি না। তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি কিনে আনছি।“

বেশিদূর যদিও যেতে হল না তাকে। চিকলেট কিনেই একটা সঙ্গে সঙ্গে মুখে পুরে দিল সে। আরও কয়েকটা কিনে নিলো, পরে খাবার জন্য। মনালীর কাছে ফিরে এসে দেখল, সে বিশাল নাগরদোলার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকেও একটা চিকলেট খেতে দিল অনির্বাণ। মনালী চিকলেটটা মুখে পুরে কয়েকবার চিবিয়ে নাগরদোলার দিকে তাকিয়ে বলল- “তুমি কখনও এইরকম নাগরদোলায় চড়েছ?”

অনির্বাণ- “না। এত উঁচু নাগরদোলা দেখলেই ভয় করে, সেটা আবার চড়া।“
মনালী- “এমা, তুমি এত ভয় পাও। এই তো দেখ কতজন চড়ছে। সবাইতো ভীষণ মজা করছে। ভয়ের কি আছে?”
অনির্বাণ- “তুমি কি ওতে চড়ার প্লান করছ নাকি?”
মনালী উৎসাহিত হয়ে পড়ল- “চড়বে? ভীষণ মজা হবে।“
অনির্বাণ- “খেপেছ, ফুচকা খেতে গিয়ে জান প্রায় বেরিয়ে গিয়েছিল। এটা চড়লে নির্ঘাত হার্ট-অ্যাটাক হয়ে সটান উপরে চলে যাব।“
মনালী একটু গম্ভীর হয়ে বলল- “আচ্ছা, ছাড়।“

অনির্বাণের কেমন যেন মনে হল মনালী দুঃখ পেয়েছে। বিশেষত ফুচকার প্রসঙ্গটা ওভাবে বলার জন্য হয়ত সে হার্ট হয়েছে। ব্যাপারটা মেক-আপ করতে গিয়ে বলল- “তবে, এমনিতে মারা গেলে পিছনে কাঁদার কেউ নেই। তাই চড়া যেতেই পারে।“
মনালী উত্তেজিত হয়ে বলল- “সত্যিই চড়বে? ভেবেচিন্তে বলছ তো?”
অনির্বাণ- “হ্যাঁ, দাঁড়াও টিকিট কেটে আনি।“
মনালী তাকে বাধা দিল- “দাঁড়াও। দেখ এইরকমভাবে একজনের খরচা অন্যজন করলে দুজনেরই খারাপ লাগবে। বেটার হয় যে যার নিজের খরচ দিক। সেটাই সবদিক থেকে ভাল।“

অনির্বাণ খুশি না হলেও মনালীর যুক্তি খণ্ডন করতে পারল না। সে রাজী হল।

1026658_webটিকিট কেটে দুরু দুরু বুকে মনালীর সাথে প্রায় চারতলা উঁচু নাগরদোলায় উঠে বসল অনির্বাণ। প্রতিটি খোপে দুজন বসতে পারে। সামনের সেফটি রডটা ভাল করে চেক করে নিলো নাগরদোলার অ্যাটেনডেনট। তারপর দুজনে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে শুরু করল। আরও চারজন বসার পর তাদের রাইড শুরু হয়ে গেল। হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে অনির্বাণের। উপরে ওঠার সময় সেরকম ভয় করছে না। কিন্তু নামার মুহূর্তটা যেন ভয়ানক। চার পাঁচ বার পুরোপুরি ঘোরার পর ব্যপারটা সহজ হয়ে গেল তার কাছে। ভয়টাও অনেকটা কমে গেল তার। তখনই সে তার ডানহাতে যন্ত্রণা অনুভব করল। তাকিয়ে সে দেখল মনালী তার হাতটা ভীষণ জোরে চেপে ধরে আছে। তার একটা নখ হাতের চামড়াকে ভীষণভাবে আঘাত করছে। মনালীর দিকে তাকিয়ে দেখল তার চোখ বন্ধ। অনির্বাণ কিছু বলল না। রাইডের বাকী সময়টুকু সে সেই আঘাত সহ্য করল।

নাগরদোলা থেকে নেমে সে হেসে মনালীকে বলল- “আমি ভেবেছিলাম একা আমারই এটা প্রথম রাইড ছিল। সেটা কিন্তু নয়। তাইতো?”

মনালী উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসল। অনির্বাণ তার ডান হাতের নখের দাগটা মনালীকে দেখাল- “দেখ কী করেছ? ভীষণ ভয় পেয়েছিলে তো!”
মনালী লজ্জিত হয়ে বলল- “এমা। এক্সট্রিমলি সরি। তোমার নিশ্চয়ই ভীষণ ব্যথা করছে।“
অনির্বাণ- “না না, ঠিক আছে এখন। কিন্তু আমি বুঝতে পারলাম না, তুমি যখন ভয় পাচ্ছিলে তাহলে নিজেই চড়তে চাইলে কেন?”
মনালী- “আগে পুজোয় যতবার বেরোতাম, বন্ধুরা নাগরদোলা চড়তে জোর করত। প্রতিবারই না করে দিতাম। চড়ার সাহস জোগাড় করতে পারি নি কখনও। মরে যাওয়ার ভয় ছিল। এখন তা নেই, তাই ভয়টাকে জিততে ইচ্ছে হল।“

শেষ কথাটা কেমন যেন বিষাদময় ঠেকল অনির্বাণের। কিন্তু তা নিয়ে সে কোন প্রশ্ন করল না। বলল- “তবে জান, বেশ ভাল লাগছে। আরেকটা রাইড চড়বে?”
মনালী- “তা চড়তে পারি। তবে নাগরদোলা নয়।“

দুজনেই হেসে উঠল। অপেক্ষাকৃত সহজ আরো একটা রাইড চড়ে নিলো তারা। বেশ মজা করল রাইডটাতে। শেষ হতেই মনালী বলল- “ভীষণ খিদে পাচ্ছে। হেভি কিছু খেয়ে নিলে হত না।“
অনির্বাণ- “খুব খারাপ কিছু বল নি। খিদে আমারও পেয়েছে। কী খাবে ঠিক করেছ?”

দুজনে মিলে ঠিক করল এগ চ্যাউমিন খাবে। খেতে বসে অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল- “পুজোয় কখনও হোল নাইট ধরে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছ?”

মনালী- “না, হোল নাইট কোনবার ঘুরি নি। তবে আমরা বন্ধুরা বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়তাম। ফিরতাম সাড়ে দশটা, এগারোটা। সাড়ে এগারোটাও একবার হয়ে গেছে। তবে অনেকে ঘোরে শুনেছি। তোমার বুঝি হোল নাইট ঘুরতে বেশি ভাল লাগে?”
অনির্বাণ- “হ্যাঁ, আমরা বন্ধুরা মিলে একদিন হোল নাইট ঘুরতাম। নর্থ কলকাতার ঠাকুরগুলো ঐদিন দেখে নিতাম। বাকী দিনগুলোতে সাউথ কলকাতাতেই থাকতাম।“
মনালী- “হোল নাইটে ভীষণ মজা হতো?”
অনির্বাণ- “মজা হবে না। বন্ধুরা থাকলে তো সব সময়য়ই মজা হয়।“
মনালী- “তা, ঠিক বলেছ।“

খাওয়া শেষ করে একদান করে বেলুনে বন্ধুকের নিশানা করে নিলো তারা। রাত বারোটা বাজে। মনালী হাতের ঘড়িটা দেখে বলল- “তোমার সঙ্গে ঘুরে বেশ ভাল কাটল দিনটা। কিন্তু এবার আমাকে বাড়ী ফিরতে হবে।“

অনির্বাণ- “তাইতো, এত রাত হয়ে গেছে টের পাই নি। তোমার হয়ত ভীষণ দেরী হয়ে গেল।“
মনালী- “না, না ঠিক আছে। পুজোর দিনে বারোটা কী আর বাকী দিনগুলোর মতো মনে হয়।“
অনির্বাণ- “তুমি একা ফিরবে? আমি কি ছেড়ে দিয়ে আসব?”
মনালী- “না, তার আর দরকার হবে না। আমি তো বাসে করে যাব। তোমায় আর কষ্ট করতে হবে না।“
অনির্বাণ- “আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে আমিও বাসে করে বেরিয়ে যাব। চল, বাস স্টপের দিকে এগোই।“

বেশ কাটল সন্ধ্যেটা তার মনালীর সাথে। একটা মানসিক আঘাত থেকে তাকে উদ্ধার করে মনালী নিয়ে গিয়েছিল এক সুন্দর জগতে। আবিষ্ট হয়ে পড়েছিল তার সংস্পর্শে। বিদায়ের কথা সে আবেশ শিথিল করে দিল। আবার মনটা খারাপ হয়ে গেল অনির্বাণের। এই কয়েকঘণ্টার আলাপে মনালী একজন অপরিচিত থেকে তার পরম বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু আর কি তার সঙ্গে দেখা হবে না? সে কি হারিয়ে যাবে এই রাত্রির পর? তার কাছে মনালীর ফোন নাম্বার বা বাড়ীর ঠিকানা নেই যে তাকে সে আবার যোগাযোগ করতে পারবে। তথ্যগুলো বড়ই ব্যক্তিগত। বিশেষত একটি মেয়ে একজন অজানা ছেলেকে তা বলবে কেন?

সাহস সঞ্চার করে অনির্বাণ বলল- “কিছু যদি মনে না কর, আবার একটা পার্সোনাল প্রশ্ন করতে পারি?”
মনালী- “আচ্ছা বল।“
অনির্বাণ- “কাল কি তুমি বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে বেরোচ্ছ?”
মনালী- “না, সেই রকম কোন প্লান আপাতত নেই। কেন বল তো?”
অনির্বাণ- “যদি কোন প্লান না থাকে, তাহলে কি কালও দেখা করা সম্ভব?”
মনালী- “আচ্ছা ভেবে দেখব। এখন কথা দিতে পারছি না।“
অনির্বাণ- “কিন্তু আমি জানব কি করে? যদি কিছু মনে না কর, তোমার মোবাইল নাম্বার কি দিতে আপত্তি আছে?”
মনালী- “আমার কোন মোবাইল নেই।“
অনির্বাণ- “তাহলে?”
মনালী- “তোমার মোবাইল থাকলে আমাকে নাম্বারটা দাও। আমি ফোন করে জানিয়ে দেব।“

অনির্বাণ খুশি হল। অনিশ্চিত হলেও কোন একটা ভাবে মনালীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকবে। সে মানিব্যাগ থেকে তার বিজনেস কার্ডটা বার করে মোবাইল নাম্বারটা দেখিয়ে দিল। মনালী সেটা পার্সের মধ্যে রেখে দিল।

বাসস্টপে পৌঁছনোর কয়েক মিনিটের মধ্যে মনালীর বাস চলে এলো। গুড নাইট সম্বোধন করে দুজনে দুজনের কাছ থেকে বিদায় নিলো। তার কিছুক্ষণ পরে অনির্বাণ উঠে পড়ল নিজের বাসে।

সারাদিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও রাতে ঘুম আসতে দেরী হল অনির্বাণের। সারাক্ষণ মনালী তার চিন্তা জুড়ে থাকল। তার সংস্পর্শে থাকার সময়টুকুর কথা ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। মোবাইলের অ্যালার্ম পরদিন সকাল হয়ে যাওয়ার জানান দিল। অপর্যাপ্ত ঘুম সত্ত্বেও উত্তেজিত হয়ে সে উঠে পড়ল। আজও অফিস আছে তার। স্নান করতে যাবার সময় ডান হাতটা দেখল সে। মনালীর নখের দাগ মিলিয়ে গেছে। মনালীর স্পর্শ যেন সে অনুভব করল। নাগরদোলায় চড়ার কথা মনে করে আপনমনে হেসে উঠল সে।

অফিসে আজ কাজে মন বসছে না অনির্বাণের। সারাক্ষণ তার চিন্তার মধ্যে মনালী ঘুরছে। ঘন ঘন মোবাইলটার দিকে লক্ষ্য করছে সে। অচেনা নাম্বার থেকে কল এলেই উদ্দীপ্ত হয়ে ফোন ধরছে। মাঝে মাঝে অকারণে হেসে ফেলছে। সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেও অনেক সময় আনমনা হয়ে পড়ছে। তার অবস্থা লক্ষ্য করে তার জুনিয়র রমেশ বলে উঠল- “কী ব্যাপার অনির্বাণদা, প্রেমে টেমে পড়েছ নাকি?”

অনির্বাণ হেসে বলল- “তোর মাথা খারাপ হয়েছে। যা গিয়ে নিজের কাজ কর।“
রমেশ- “তুমি কথা টেলে দিলে, কিন্তু তোমার মুখের জেল্লা বলছে তুমি প্রেমে পড়েছ।“

এটাই কি প্রেম? প্রেমে সে আগে কোনদিন পড়ে নি। তাই তার জানা নেই। টয়লেটে গিয়ে বেসিনের উপর আয়নায় নিজেকে একবার দেখল সে। কই, কিছুই তো নতুন লাগছে না! রোজকারের মতোই মনে হচ্ছে। ক্যান্টিনে লাঞ্চ করার সময় সিনিয়ররা তার অবস্থা নিয়ে মস্করা করে গেল। কথাগুলি শুনতে তার যদিও খারাপ লাগছে না, কিন্তু মনের টেনশন বেড়ে চলেছে- এখনও কোন ফোন এলো না মনালীর। লাঞ্চ শেষ হবার আগে আবার একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো তার মোবাইলে। সে একটু উঠে গিয়ে ফোনটা ধরল। সিনিয়ররা পিছন থেকে টিপ্পনী দিল- “প্রেমিকা ফোন করেছে, ঠিকঠাক খেল কিনা চেক করছে।“

তাদের হাস্যোল্লাসের মধ্যে ফোনটা ধরল সে- না, মনালীর ফোন নয়। ক্রেডিট কার্ডের অফারের ফোন। বিরক্ত হয়ে “নট ইন্টারেস্টেড” বলে ফোনটা কেটে দিল সে।

বার বার মোবাইলে সময়টা দেখে নিচ্ছে সে। আড়াইটে, পৌনে তিনটে, তিনটে, সাড়ে তিনটে- সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলেছে মনের অস্থিরতা। লাঞ্চের পর থেকেই অফিস মোটামুটি ফাঁকা হয়ে গেছে। যে কজন বাকী আছে তারাও বাড়ী ফেরার তোড়জোড় করছে। চারটের মধ্যে অফিস ফাঁকা হয়ে গেল। সিকিউরিটি গার্ডরা ছাড়া অফিসে আর কেউ রইল না। সহকর্মীদের সাথে কথা বলে সে মনের উত্তেজনা প্রশমিত করে রাখতে পেরেছিল। একা পড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে টেনশনটা হতাশায় পরিণত হতে থাকল।

তার এই অন্ধকার, নিঃসঙ্গ জীবনে মনালী এক জোনাকির মতো এসে তার মনটা আলোকিত করেছিল। সে ভেবেছিল হয়ত এই অন্ধকার জীবনের পালা শেষ। কিন্তু তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হতে চলেছে। তার সাথে একরাতের আলাপ নিশ্চয়ই মনালীর মনে দাগ কাটে নি। কাটলে ভদ্রতাস্বরূপ হয়ত তাকে ফোন করে আজকের সাক্ষাৎ নাকচ করে দিত। মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে। কান্না পেয়ে যাচ্ছে তার। ঐ সামান্য সময়ের পরিচয়ে মনালী তার মনের গভীরে ঠাঁই নিয়ে ফেলেছে। তাহলে রমেশের কথাই কি ঠিক? প্রেম? লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট? যদিও এখন এসব ভেবে তার কোন লাভ নেই। হয়ত আর কোনদিন তার সাথে দেখা হবে না। মনালীর পার্সের ভিতর থেকে একদিন তার নাম্বারসমেত কার্ডটা স্থান নেবে ডাস্টবিনে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়ল অনির্বাণ।

সাড়ে চারটে নাগাদ বেজে উঠল অনির্বাণের মোবাইল। ফোনটা ধরতেই বেশ আওয়াজ কানে এলো তার। কোন পূজামণ্ডপের কাছাকাছি থেকে ফোনটা এসেছে।

stock-footage-hyderabad-india-september-a-smart-phone-ringing-for-an-incoming-call-on-a-table-and-a-guyঅনির্বাণ- “হ্যালো।“
অপর প্রান্তে- “হ্যালো, অনির্বাণ?”

সে চিনতে পারল মেয়েলী কণ্ঠস্বর। মনটা ভরে গেল খুশিতে।

অনির্বাণ- “হ্যাঁ।“
অপর প্রান্তে-“অনির্বাণ, আমি মনালী।“
অনির্বাণ- “হ্যাঁ, মনালী বল। কেমন আছ?”
মনালী- “ভাল আছি। ফোন করতে দেরী হয়ে গেল। তুমি বলেছিলে আজ বেরোতে পারবে কিনা জানাতে- তা আমার কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। তুমি ফ্রী থাকলে আমরা বেরোতে পারি।“
অনির্বাণ- “আমারও কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই। কটা নাগাদ, কোথায় মিট করতে পারবে বল?”
মনালী- “সাড়ে ছটা নাগাদ, বাবুঘাটে কালকের জায়গায় দেখা করলে কেমন হয়?”
অনির্বাণ- “ঠিক আছে, আমি পৌঁছে যাব।“
মনালী- “বেশ, তাহলে দেখা হচ্ছে। এখন রাখছি।“

খুশির সীমা ছাড়িয়ে গেছে অনির্বাণের। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ীর জন্য রওনা দিল সে। বাড়ী ফিরে আরেকবার স্নান করে প্রস্তুত হয়ে নিল। একটা নতুন লাল কালো চেক সার্ট আর কালো জিন্স পরে যথাসময়ে পৌঁছে গেল বাবুঘাট। আগের দিনের জায়গায় পৌঁছে সে দেখল মনালী আগেই পৌঁছে গেছে। একমনে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আছে। পিছনে এসে সে হেসে বলল- “আমার আসতে বোধহয় একটু দেরী হয়ে গেল।“

মনালী ঘুরে তাকাল। তার দিকে তাকিয়ে অনির্বাণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে গেল। এ কাকে দেখছে সে! গতকালের মনালীর সাথে এই মনালীর আকাশপাতাল তফাৎ। একটা নীল সূক্ষ্ম কাজের সালোয়ার কামিজ পরেছে সে আজ। ঠোঁটটা লাল লিপস্টিকে আবৃত, মুখটা গ্লো করছে। বেশি মেকআপ নেই, তবু কাজলটানা চোখটা তার রূপটাকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মনালী হাতের ঘড়ি দেখে হেসে বলল- “কই, তুমি তো ঠিক সময়েই এসেছ। আমি একটু আগে পৌঁছেছি।“
অনির্বাণ- “তবু আমার জন্য তোমাকে অপেক্ষা করতে হল। আমার খুব খারাপ লাগছে।“
মনালী- “খারাপ লাগার কিছু নেই। তা আজ কোথায় যাবে কিছু ঠিক করেছ?”
অনির্বাণ- “না, সে রকম কিছু ঠিক করি নি। আজ ঠাকুর দেখতে বেরোলে কেমন হয়?”
মনালী- “আমার আপত্তি নেই।“
অনির্বাণ- “নর্থের দিকের ঠাকুর ও প্যান্ডেলগুলো বেশ ভাল হয়। ভিড়ও অপেক্ষাকৃত কম থাকে। ওদিকে যাবে?”

মনালীর হাসি মিলিয়ে গেল। সে অস্ফুট উচ্চারণ করল- “আবার নর্থ!”
অনির্বাণ- “তোমার আপত্তি থাকলে ওদিকে যাবার দরকার নেই। আমরা বন্ধুরা জেনারেলই অষ্টমীর দিন হোল-নাইট বেরোতাম। তাই না ভেবে বলে ফেলেছি।“
মনালী- “আচ্ছা চল। তবে হোল-নাইট ঘোরা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।“
অনির্বাণ- “না না, হোল-নাইট একেবারেই নয়। গতকালের মতো সময়ে ফিরলেই হবে তো?”
মনালী- “আরেকটু দেরী হলে অসুবিধা নেই। তবে বেশি রাত হলে বাস পাওয়াটা অসুবিধাজনক।“
অনির্বাণ- “না না ওসব নিয়ে ভেবো না। আমরা তো আর সব ঠাকুর দেখব না যে এত সময় লাগবে।“
মনালী- “এখনই বেরোবে?”
অনির্বাণ- “আমার কোন তাড়া নেই। তুমি যখন বলবে বেরোবো।“
মনালী- “সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে। এখানে কিছুক্ষণ বসলে কি খুব দেরী হয়ে যাবে?”
অনির্বাণ- “দেরী হবে কেন? হাওয়াটা বেশ লাগছে আমারও। দাঁড়াও চা নিয়ে আসি।“

মনালী কিছু বলতে যাচ্ছিল, অনির্বাণ বাধা দিয়ে বলল- “এই চা-টা আমি স্পন্সর করছি। কোন আপত্তি শুনব না।“

মনালী আর কোন কথা না বলতে পেরে হাসল। অনির্বাণ খুশি হল। ঠাকুর দেখার ইচ্ছে তার সেরকম নেই। এখানেই মনালীর সাথে সে একা থাকতে পারে। প্রাণভরে তাকে দেখতে পারে সারাক্ষণ।

চা নিয়ে মনালীর পাশে এসে বসল সে। বলল- “তোমার বুঝি এখানে আসতে খুব ভাল লাগে?”
মনালী- “ভীষণ। মন খারাপ হলেই এখানে চলে আসি। মুহূর্তের মধ্যে মনটা ভাল হয়ে যায়।“

মনালীর কথায় অসম্মত হতে পারল না অনির্বাণ। লোকে বলে গঙ্গায় ডুব দিলে সমস্ত পাপ মিটে যায়। কিন্তু বাবুঘাটের গঙ্গার দিকে তাকালে মন ভাল হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। গঙ্গার কী অপরূপ মহিমা।

ট্যাক্সি করে তারা প্রথমে পৌঁছল শিয়ালদা। সেখানে তারা দেখে নিলো শিয়ালদা অ্যাথলেটিক ক্লাবের মণ্ডপ ও প্রতিমা। সন্ধ্যের স্ন্যাক্স বাবদ দুটো চিকেন রোল হজম করল তারা। এরপর পদব্রজেই বেরিয়ে পড়ল চালতাবাগানের পুজোর দিকে। পথে যেতে যেতে অনির্বাণ তাদের হোল-নাইট ঘোরার কিছু মজার অভিজ্ঞতার কথা শুরু করল। শিশির ছিল এই সব মজার ঘটনার প্রধান পাত্র।

6271471373_a3b811c732_zঅনির্বাণ- “একবার আমরা পুজো দেখতে বেরিয়েছি ড্রিঙ্ক করে।আমরা মানে আমি, শিশির আর সুনীল। সবার মুখেই মদের গন্ধ ভুর ভুর করছে। কলেজ স্কোয়ার থেকে সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের দিকে যাওয়ার পথে পড়ে গেলেন শিশিরের মেসোমশাই। আমি আর সুনীল আগেই লক্ষ্য করে দূরে দাঁড়িয়ে পড়লাম। শিশির খেয়াল না করে কথা বলতে বলতে এগিয়ে যাচ্ছিল। হটাত সামনে মেসোমশাইকে দেখে থমকে গেল। গন্ধ লুকানোর জন্য মুখ চাপা দিল। মেসোমশাই কী হয়েছে জানতে চাইলেন। শিশির দেখি মুখ চেপে বলছে – পিছলে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল, তাই মুখে চোট লেগেছে, ভীষণ ব্যথা করছে। মেসোমশাই ব্যস্ত হয়ে দেখতে চাইলেন। শিশির দেখি আমতা আমতা করছে। এই অবস্থায় তাকে এসে উদ্ধার করল মাসীর মেয়ে। সে শিশিরকে কাছের একটা ওষুধের দোকান দেখিয়ে ওষুধ কিনে নিতে বলল। আর ইম্পরট্যান্টলি মেসোমশাইকে সেখান থেকে নিয়ে চলে গেল। ওরা চলে যাবার পর আমরা হাসি চাপতে পারলাম না। পেট চেপে হেসে ফেললাম। শিশির আমাদের কিছু কাঁচা গালাগালি দিল আগে থেকে ওকে সজাগ করে দিই নি বলে। সেই ঘটনার পর আমরা ড্রিঙ্ক করে আর কখনও ঠাকুর দেখতে বেরোই নি।“

বর্ণনার মধ্যে কিছুটা অংশ সে অভিনয় করে দেখাল। মনালী খিল খিল করে হেসে ফেলল। বলল- “ভীষণ বেঁচে গেছিলে সেদিন তাহলে। তখন কি কলেজে পড়তে?”
অনির্বাণ- “না, তখন টুয়েলভে পড়ি। বাড়ীতে জানতে পারলে সত্যিই চাপ হয়ে যেত। তবে মাসীর মেয়ে সেদিন সাহায্য করলেও পরে দুবার শিশিরকে ব্ল্যাক-মেল করে কোল্ড-ড্রিঙ্ক খেয়েছিল।“
মনালী- “ঠিক করেছিল। ব্ল্যাক-মেল কেন, তোমাদেরই খাওয়ানো উচিৎ ছিল।“

চালতাবাগানের পর তারা কাছের সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোটাও দেখে নিলো। পরের মণ্ডপ কিছুটা দূরে। আরও একটি মজার ঘটনা বলা শুরু করল অনির্বাণ।

অনির্বাণ- “সেবার ঘুরতে বেরিয়ে পৌঁছেছি বাগবাজার সার্বজনীন। সেদিন ভীষণ বৃষ্টি হয়েছিল। মাঠ ভর্তি কাদা। পুজো দেখে বেরোনোর সময় রুমাল বার করতে গিয়ে শিশিরের মোবাইলটা রুমাল সমেত পড়ল নর্দমায়। শিশির যদিও সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিলো মোবাইলটা। কিন্তু হাত ও মোবাইলটা কাদা ভরা জলে ভিজে গেল। আমি ও সুনীল কেউ রুমাল দিতে রাজী হলাম না। বললাম একটা জল কিনে ধুয়ে নে। শিশির বলল- জল কিনতে হবে না। এই বলে ও আবার প্রতিমা দর্শনের ভিড় লাইনের দিকে গেল। পাঁচ মিনিট পরে ফিরে এলো। দেখি হাত ও মোবাইল পরিষ্কার। জিজ্ঞেস করলাম কি দিয়ে পরিষ্কার করলি। ও বলল, লাইনের মধ্যে একজন সাদা পাঞ্জাবী পড়েছিল। ভিড় লাইনে ধাক্কাধাক্কি করার মাঝে তার জামায় দুটোই পরিষ্কার করে নিয়েছে।“

মনালী হাসতে হাসতে বলল- “ইস, ছি ছি, তোমরা সত্যিই! কী করে পারলে! দিস ইজ টু মাচ!”
অনির্বাণ-“শিশির ছিল আমাদের এন্টারটেইনমেন্ট ফ্যাক্টর। ও না থাকলে হোল-নাইটগুলো জমত না।“
মনালী- “এত মজা করতে যখন, তখন আর বেরোও না কেন?”

অনির্বাণ চুপ করে গেল।
মনালী- “ঐ ঘটনার পর থেকে বুঝি বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখ না?”

এবারেও অনির্বাণ কথা বলল না।

মনালী- “দেখ, আমার হয়ত বলা উচিৎ নয়। তবু বলছি, ঐ ঘটনার জন্য তোমার বন্ধুরা কেউই দায়ী নয়। ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট। মিথ্যা অভিমান করে এত ভাল বন্ধুদের দূরে সরিয়ে রাখাটা অন্যায়। বন্ধু ছাড়া এই জীবনের পথ চলা যে কী কঠিন তা আমার থেকে বেশি বোধহয় কেউ জানে না।“
মনালী একটু থামল, তারপর হেসে বলল- “জীবনটা অনেক বড়। এই সামান্য অভিমান করে বন্ধুত্ব নষ্ট করে ফেল না। ফ্রেন্ডস আর প্রেশাস।“

দুজনে চুপ করে হাঁটতে থাকল। কিছুক্ষণ পরে অনির্বাণ স্তব্ধতা ভঙ্গ করল- “তোমার বন্ধু নেই?”
মনালী- “আমি তোমার মত লাকি নই।“
অনির্বাণ- “কেন?”
মনালী- “সবার ভাগ্য কি একইরকম হয়?”

আহেরীটোলা পুজোর কাছে পৌঁছে গেছে তারা। ভীষণ ভিড়। দর্শনার্থীরা লাইন দিয়ে প্রবেশ করছে। পাশে ভিআইপি-দের জন্য আলাদা লাইন। বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে লাইনগুলো ভাগ করা। ভিআইপি লাইনটা একদম ফাঁকা। কিন্তু দুজন পাস চেক করছে যা ওদের কাছে নেই।

অনির্বাণ- “এতো ভীষণ ভিড়। এখান থেকে অনেকটাই যেতে হবে।“
মনালী- “তাহলে কি স্কিপ করবে?”
অনির্বাণ- “অফিসের কয়েকজন বলল বেশ ইউনিক করেছে এবার ওরা। দাঁড়াও একটা কাজ করি।“

মনালীকে নিয়ে ভিআইপি লাইনের পাশের ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলল অনির্বাণ। কিছুদূর গিয়ে ব্যারিকেডের মধ্যে দিয়ে নিজের শরীর গলিয়ে ভিআইপি লাইনের প্রবেশ করল সে।

মনালী আঁতকে উঠল- “কী করছ?”
অনির্বাণ- “কথা বোলো না, তাড়াতাড়ি চলে এস।“

মনালীর পক্ষে একটু অসুবিধা হল ব্যারিকেড পেরোতে। ঢুকেই তার নজরে পড়ল পাশের জেনারেল লাইনে একজন মাঝবয়েসী ভদ্রলোক তাদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছেন। সে মাথা নিচু করে লাইনে এগিয়ে গেল।

মনালী- “এইরকমভাবে ভুল লাইনে ঢোকা কিন্তু অনুচিত।“
অনির্বাণ- “এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ… অ্যাই মীন পুজো দেখা।“

8105951473_e1e30e3477_zদুজনেই হেসে ফেলল। কিন্তু তাদের হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। প্যান্ডেলে ঢোকার আগেই আবার চেকিং-এ ধরা পড়ে গেল। অনির্বাণ বয়েসে ছোট ছেলেটিকে দাদা বলে ম্যানেজ করে নিলো। মনালী মুচকি হাসতে থাকল।

প্যান্ডেলে প্রবেশের জায়গাটাতে ভীষণ ভিড়। ধীরে ধীরে সবাই এগোচ্ছে। পিছনে কিছু অত্যুতসাহী দর্শকদের ঠেলার চোটে মনালী হুমড়ি খেয়ে পড়ল অনির্বাণের পিঠে। মনালীর হাত ও বুকের স্পর্শ অনির্বাণকে শিহরিত করল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে পিছনে চিৎকার করে বলল- “দাদা কী হচ্ছে, ঠেলছেন কেন?”

মনালী লজ্জিত হয়ে পড়েছে, অনির্বাণ তাকে সামনে চলে আসতে বলল। মনালী মাথা নিচু করে অনির্বাণের সামনে চলে এলো। অস্বস্তি বোধ করল অনির্বাণ। আগে কয়েকবার এই রকম ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু মনালীর স্পর্শের অনুভূতি যেন অতুলনীয়।

প্যান্ডেল ও প্রতিমা দেখে বের হয়ে তারা ডিনার করে নিলো- মটন-বিরিয়ানি, চিকেন চাঁপ ও লস্যি। এরপর তারা এগিয়ে চলল কুমোরটুলি পার্কের পুজোর দিকে। কিছুদূর এগোতেই দুজনের গায়ে জলের ফোঁটা পড়ল। পুজো দেখতে গিয়ে তারা খেয়াল করে নি কখন আকাশটা মেঘে ঢেকে গেছে। দুজনের কাছেই ছাতা নেই, বেরোবার সময় তারা বৃষ্টির কথা ভাবে নি। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি থেকে কয়েক মিনিটের মধ্যে জোরে বর্ষণ শুরু হল। অনির্বাণ কাছেই একটা শেড লক্ষ্য করল। ওরা দৌড়ে তার নীচে আশ্রয় নিলো। খুব ছোট শেডটা, একরকম ভাঙা। একজনের আশ্রয় নেবার পক্ষে উপযুক্ত। কিন্তু দুজনের পক্ষে যথেষ্ট নয়। মনালীকে সুরক্ষিত করে অনির্বাণ তার পাশে দাঁড়িয়ে ভিজতে থাকল। মনালী তা লক্ষ্য করে বলল-“একী, ভিজে যাচ্ছ তো, আরও পাশে এস।“

দুজনের মধ্যে যৎসামান্য ব্যবধান রেখে অনির্বাণ তার পাশে দাঁড়াল। কিন্তু তার ডান কাঁধটা ভিজে যাচ্ছে। মনালী অনির্বাণের অস্বস্তির কথা বুঝতে পেরে বলল- “আমাকে ঠেস দিয়ে দাঁড়াও।“

মনালীর কাঁধ স্পর্শ করে দাঁড়িয়েও কিছু লাভ হল না। অনির্বাণের কাঁধটা ভিজতেই থাকল। পাশাপাশি আর ঠেস দিয়ে দাঁড়ান সম্ভব নয়।

মনালী- “তুমি তো তাও ভিজে যাচ্ছ। এক কাজ কর- আমাকে ফেস করে দাঁড়াও।“

খুব মন্দ বলে নি মনালী। পাশে খুব একটা জায়গা না থাকলেও সামনের দিকে কিছুটা জায়গায় জল পড়ছে না। কিন্তু মনালীর সামনে দাঁড়াতে অস্বস্তি বোধ করল অনির্বাণ।

মনালী- “কী হল, সামনে ফেস করে দাঁড়াও।“

অনির্বাণ প্রসারিত দু হাত দেওয়ালে ঠেকিয়ে মনালীর সামনে দাঁড়াল। মনালী ডানদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে রইল। বড় অস্বস্তিকর এভাবে দাঁড়ানো দুজনের পক্ষে। কিন্তু দুজনের একসঙ্গে বৃষ্টি থেকে বাঁচার আর কোন উপায় নেই। মনালীর নিঃশ্বাস বাঁ হাতের উপর অনুভব করল অনির্বাণ। মনালীর নিঃশ্বাসের তেজ বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে অনির্বাণের হৃৎস্পন্দনও। বাঁ হাতটা সরিয়ে নেবার চেষ্টা করল অনির্বাণ। কিন্তু বাতাসের তেজে বেশমাল হয়ে আবার হাতটা দেওয়ালে ঠেকাতে বাধ্য হল।

কোন মেয়ের এত কাছে কখনও আসে নি অনির্বাণ। পারফিউমের গন্ধ তাকে বিমোহিত করল। তার মনে হল সে আর এই জগতে নেই। সারাদিন যে তার চিন্তার মধ্যে ছিল, সে তার আলিঙ্গনের কয়েক মুহূর্ত দূরে। তার হৃদয়ের সমস্ত সংকোচ যেন ভেঙে যেতে থাকল, মনে হল দুহাত দিয়ে জড়িয়ে মনালীকে বুকে টেনে নিতে। দেওয়ালে ঠেকানো হাতগুলো যেন পিছলে যেতে থাকল। মনকে কোনরকমে সংযত রাখল সে।

মিনিট দশেক পর বৃষ্টি বন্ধ হল। উড়ে যাওয়া মেঘের বৃষ্টি। কিন্তু এই সময়টুকুর মানসিক যুদ্ধ অনির্বাণকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। ওরা ভেজা রাস্তা দিয়ে আবার হাঁটা শুরু করল। দুজনেই নির্বাক এবং দুজনের ব্যবধান যেন আগের তুলনায় বেশি। অনির্বাণ বেশ কয়েকবার মনালীর দিকে তাকাল। প্রতিবারই দেখল মনালী মাথা নিচু করে তার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে।

মনালীকে সামনে রেখে লাইন দিয়ে কুমারটুলি পার্কের ঠাকুরটা দেখে নিলো তারা। এক দর্শনার্থীর মোবাইলে কথোপকথনে অনির্বাণের খেয়াল হল রাত বারোটা বাজে। সে মনালীকে বলল- “চল এবার ফেরা যাক।“

মনালী সম্মতি জানাল।

অনির্বাণ- “বাসে ফিরবে না ট্যাক্সি নেব?”
মনালী- “বাসটাই প্রেফারেবল।“
অনির্বাণ- “চল এক কাজ করি, এখান থেকে ডায়রেকট বাস পাওয়া কঠিন হবে। ধর্মতলা চলে যাই। ওখান থেকে অনেক বেশি বাস পাওয়া যাবে।“
মনালী- “বেশ তাই চল।“

বাসস্টপে এসে দুজনে ধর্মতলার বাস ধরল। মনালী বসার সীট পেল। অনির্বাণ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। ভিড়ের মধ্যে কথা বলা হল না তাদের মধ্যে। ধর্মতলায় বাসের অপেক্ষায় বসে অনির্বাণ বলল- “আচ্ছা, আগামীকালও কি বেরোতে পারবে আমার সঙ্গে?”
মনালী মিষ্টি হেসে বলল- “আচ্ছা, বেরবো।“
অনির্বাণ খুশি হয়ে বলল- “কাল তাহলে সাউথের দিকের কটা ঠাকুর দেখা যাবে। কী বল?”
মনালী- “আচ্ছা।“
অনির্বাণ- “তাহলে সাউথের দিকে কোন জায়গায় মিট করলে কেমন হয়?”
মনালী- “সেটাই ভাল।“
মনালীর বাস দেখা গেল। সে বলল- “আমার বাস চলে এসেছে।“
অনির্বাণ- “কালকের মিটিং পয়েন্ট ঠিক হল না যে?”
মনালী- “চিন্তা নেই, আমি ফোন করে নেব।“
অনির্বাণ মাথা চুলকে বলল – “একটু বেলার দিকে ফোন করলে ভাল হয়।“
মনালী হেসে বলল- “আচ্ছা, চেষ্টা করব। গুড নাইট।“

কথোপকথনের মধ্যে বাসটা তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মনালী বাসে উঠে জানলার পাশে একটা সীটে বসে পড়ল। দৃষ্টির মধ্যে থাকা পর্যন্ত অনির্বাণ হাত নাড়িয়ে তাকে টাটা করতে থাকল। প্রত্যুত্তরে মনালীও হাত নাড়িয়ে বিদায় জানাল।

বাসটা দূরে চলে যাওয়ার সাথে সাথে মনটা দুঃখে ভরে গেল অনির্বাণের। সময় কত নিষ্ঠুর। কিছুক্ষণের জন্যও তো সময়টা স্তব্ধ থাকতে পারত। তাহলে সে আরও কিছু সময় মনালীর সাথে কাটাতে পারত।

ফাঁকা রাস্তা পেয়ে বাসটা বেশ স্পীডে চলছে। ঠাণ্ডা হাওয়া চুলটা এলোমেলো করে দিচ্ছে মনালীর। এবারের অষ্টমীর দিনটা তার বেশ ভাল কাটল অনির্বাণের সঙ্গে। তার সাথে সন্ধেটা কাটিয়ে মনটা ভাল ছিল- সবকিছু ভুলে থাকতে পেরেছিল। কিন্তু বাসে একা বসে সে আবার হারিয়ে গেল গত বছরের অষ্টমীর দিনটাতে।

সেদিন সে বের হয়েছিল তার বয়ফ্রেন্ড সানির সাথে। সানি মনালীর বেস্টফ্রেন্ড প্রিয়াঙ্কার দাদা। প্রিয়াঙ্কার বাড়ীতে যাতায়াতের সূত্রেই প্রেম। পুজোর অষ্টমীর সন্ধ্যেটা মনালী ডেডিকেট করে রেখেছিল সানির সাথে বেরোবার জন্য। সেদিন তার পরনে ছিল ওয়েস্টার্ন পোশাক- গাঢ় গোলাপি ভেস্টের উপরে অনেকটা গলা কাটা হলুদ টিশার্ট ও কালো জিন্সের প্যান্ট।

গড়িয়াহাটে দেখা করে সানি বলল- “চল, সেন্ট্রাল হয়ে নর্থ কলকাতার দিকে ঘুরতে যাই। ওখানে আমাদের পুরানো বাড়ীটাও দেখাতে পারব।“

মনালী রাজী হল। ওরা ট্যাক্সি করে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ চলে গেল। সেখানে নেমে মহম্মদ আলি পার্ক ও কলেজ স্কোয়ারের পুজো দেখে আবার ট্যাক্সি করে শ্যামবাজার পৌঁছে গেল। পাঁচমাথার মোড়ের ডানদিকে গিয়ে কয়েকটা রাস্তা পেরিয়ে একটা গলির মধ্যে সানি তাদের পুরানো বাড়ী দেখাল। কাছাকাছি তার স্কুলটাও দেখাল। আরেকটু এগিয়ে একটু অন্ধকার জায়গায় একটা মাঠ দেখাল।

সানি- “এই মাঠটাতে আমরা ছোটবেলা খেলতাম। কখনও ফুটবল, কখনও ক্রিকেট।“

মনালী উচ্ছ্বসিত সানির দিকে তাকিয়ে রইল। তার সবকথাই ভীষণ মধুর লাগছে মনালীর।

সানি- “এদিকে এস, একটা জায়গা দেখাই।“

মাঠের ভিতর দিয়ে সানির হাত ধরে মনালী এগিয়ে চলল। মাঠের ডানপ্রান্তে একটা খাঁজের মধ্যে সানি নিয়ে গেল। বলল- “এই জায়গাটাকে কী বলা হয় জান?”
মনালী- “আমি কি করে জানব?“
সানি- “কিসিং কর্নার।“

kiss-lips

মনালী লজ্জা পেয়ে গেল। সানি তার কাঁধ ধরে তাকে মুখের কাছে নিয়ে এলো। ঠোঁটের সম্পর্ক তাদের মধ্যে আগে কয়েকবার হয়েছিল। কিন্তু পুজোর চুম্বনের স্বাদই যেন আলাদা। দুজনে প্যাশনেট হয়ে কিস করতে থাকল। কিছুক্ষণের মধ্যে সানি মনালীর স্তন স্পর্শ করল। আগে কয়েকবার মনালী বাধা দিয়েছিল, কিন্তু আজ বারণ করল না। উত্তেজনা বাড়তে থাকল মনালীরও। সানি তার টিশার্ট ও ভেস্টটা বুকের উপর তুলে দিল। শুধুমাত্র অন্তর্বাসের উপর দিয়ে সে মনালীকে স্পর্শ করল।

উত্তেজনায় মত্ত দুজন খেয়াল করে নি, মাঠে আরও কয়েকজনের উদ্ভব ঘটেছে। তারা ফাঁকা মাঠ দেখে হাল্কা হতে চেয়েছিল। ওদের শব্দ পেয়ে খাঁজটায় গিয়ে তারা ওদের দুজনকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলে।

একজন মোবাইলের আলো ফেলে বলল- “আরে, ক্যায়া মস্ত আইটেম হ্যায় ইয়ার।“
আরেকজন বলল- “হ্যাঁ ইয়ার, একদম মস্ত হ্যায়।“
শেষজন সানিকে বলল- “ক্যায়া বস, আকেলাহি মজা লোগে? হামকো ভি তো চান্স মিলনা চাহিয়ে না।“

সানি ভয় পেল। কিন্তু মুখে বলল- “দেখো, কই বত্যমিজি নেহি, চলে যাও ইহাসে।“

মদ্যপ আগন্তুকরা শুনল না। একজন সানিকে ঘুষি মেরে ফেলে দিল। বাকী দুজন মনালীর মুখ চেপে তাকে চ্যাংদোলা করে একটা কালো জীপ গাড়িতে তুলল। অন্যজনও চলে এলো। সানি দৌড়ে ওদের ধরার আগেই গাড়ি চালিয়ে আগন্তুকরা ওখান থেকে বেরিয়ে গেল।

জীপের চালক ভীষণ জোরে গান চালিয়ে দিল। মাঝের সীটে একজন মনালীর পেটে ক্রমাগত ঘুষি মারতে থাকল। যন্ত্রণায় চিৎকার করতে থাকল মনালী। কিন্তু চাপা হাত ও গাড়ির তীব্র মিউজিক তার চিৎকার কারুর কাছে পৌঁছতে দিল না। পিছন থেকে একজন তার চোখে রুমাল বেঁধে দিল। ক্রমাগত ঘুষির চোটে তার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকল।

শহরের কোন এক নির্জন বাড়ীর সামনে গাড়িটা দাঁড়াল। তাকে একতলার কোন ফ্লাটের মধ্যে সেই পাঁচজন নিয়ে গেল। বিছানায় ফেলে তার জিন্সটা খুলে ফেলল তারা। সরিয়ে দিল তার শেষ আব্রুটাকেও। চারজন তার হাত ও পা চেপে ধরল। নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বাধা দেওয়ার বিফল চেষ্টা করল সে।

অসম্ভব যন্ত্রণা দিয়ে শুরু হল তার উপর মনুষ্য সমাজের ঘৃণ্যতম অত্যাচার। সারা শরীর কেঁপে উঠল। চীৎকার করে উঠল সে। বন্ধ ঘরের বাইরে তার আওয়াজ পৌঁছল না। প্রথমজনের লালসা পূর্ণ হলে হাতবদল হল। দ্বিতীয়জন শুরু করল তার যৌন ক্ষুধা। তৃতীয়জনের সময় সে আর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারল না, অজ্ঞান হয়ে পড়ল।

জ্ঞান ফিরে সে দেখল তাকে বাইপাসের ধারে ফেলে দিয়ে গেছে পিশাচরা। কোনক্রমে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে ভোররাতে সে বাড়ী ফিরল। দরজা খুলতেই উদ্বিগ্ন বাবাকে এড়িয়ে সে ঢুকে পড়ল নিজের ঘরটাতে। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে বাথরুমের মেঝেতে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। কী করে সে এই কথাগুলো বাড়ীতে জানাবে? ইচ্ছে করল স্নান করে পিশাচগুলোর স্পর্শের সমস্ত চিহ্ন শরীর থেকে মুছে ফেলে শুদ্ধ হতে। কিন্তু তা প্রমাণ নষ্ট করে দেবে। সে এই অন্যায় অপমান সহ্য করবে না। পিশাচগুলোকে শাস্তি দিতে হবে। মন শক্ত করল সে। দরজা খুলে সে বেরিয়ে এলো। উৎকণ্ঠিত বাবা ও সৎমা তাকে দেখে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে তাদের দিকে না তাকিয়ে বলল- “বাবা, আমাকে এখনই পুলিশ স্টেশন নিয়ে চল।“

o-CALIFORNIA-RAPE-VICTIMS-facebookমনালীর বাবা জিজ্ঞেস করলেন- “কেন কী হয়েছে?”
মনালী দরজা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল। বলল- “বাবা, অ্যাই আম রেপড।“

থানায় গিয়ে কমপ্লেন লজ করল মনালী। যে কয়েকজনের নাম গাড়িতে সে শুনেছিল তাদের নাম বলল। কয়েকজনের মুখের আবছা বর্ণনা দিতে পারল সে। ইন্সপেক্টর গাড়ির নাম্বার জিজ্ঞেস করলে মনালী জানাল সানি গাড়ির নাম্বার দেখেছে। সানিকে ফোন করা হল কিন্তু মোবাইল সুইচড অফ। প্রিয়াঙ্কার মোবাইলও সুইচড অফ পাওয়া গেল। ইন্সপেক্টর সানির বাড়ীর ঠিকানা নিয়ে মনালীকে মেডিক্যাল টেস্টের জন্য পাঠিয়ে দিলেন।

সারাদিনটা নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্দী রাখল মনালী। চোখের জলের সাক্ষী রইল বিছানার বালিশটা। রাতে ঘুমের মধ্যেও আগের দিনের ভয়ঙ্কর রাতটা বার বার তাকে জাগিয়ে তুলল। সকাল হতেই থানায় ফোন করে জানতে চাইল কেসের প্রোগ্রেস সম্বন্ধে। ইন্সপেক্টর জানালেন সানিকে তারা পায় নি। সানির বাবা জানিয়েছেন সানি গত দুদিন কলকাতার বাইরে। এইরকম ঘটনার সাথে সানি যুক্ত হতে পারে না। তবু তারা সানির বয়ান নেবার চেষ্টা করছে। কিছুদিনের মধ্যে বন্ধুদের সূত্রে সে জানতে পারল সানি নিজের বাড়ীতেই আছে। থানায় সে কথা জানালে ইন্সপেক্টর স্পষ্টভাবে তাকে জানিয়ে দিলেন সানির বাবা কিছু প্রশাসনিক মন্ত্রীদের প্রভাব খাটিয়ে সানিকে আড়াল করে রেখেছেন। এই কেসে সানিকে জেরা করা সম্ভব নয়। সে যদি আর কোন সূত্র দিতে পারে, তবেই পুলিশ এগোতে পারবে।

ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়ল মনালী। শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক গ্লানির মধ্যে দিয়েও সে ন্যায়ের লড়াইতে নেমেছিল। সেই লড়াইটাও সে হেরে গেল এক ভীরু, কাপুরুষের জন্য। নিজেকে ধিক্কার জানাল সে- এই অমানুষটাকে সে ভালবেসেছিল।

বাড়ীতেও ভীষণ অশান্তি শুরু হয়ে গেল। মনালীর সৎমা উঠতে বসতে কথা শোনাতে থাকলেন। মনালীর বাবাও রেহাই পেলেন না- “তোমার জন্যই আজ এই অবস্থা হয়েছে। পই পই করে বলতাম মেয়েটাকে শাসন কর। আজ দেখ এই মেয়ের জন্য সমাজে, আত্মীয় স্বজনদের কাছে আমাদের মাথা হেঁট হয়ে গেছে। হাসির পাত্র হয়ে উঠেছি আমরা।“

মনালীর বন্ধুরাও কেমন যেন গা-ছাড়া হয়ে গেল। কেউ তাকে আর ফোন করে না। সে ফোন করলেও ভাল করে কথা বলে না। যে মনালী বন্ধুদের মধ্যমণি ছিল সে যেন তাদের মধ্যে অছ্যুত হয়ে গেল। একটা ঘটনা তার জগতটাকে ভিন্ন করে দিল। বাবা ছাড়া আর একজনই বদলাল না তার জীবনে- তার এগারো বছরের সৎভাই পিকু। সে দিদিকে আজও কাঁদতে দেখলে বলে- “দিদি কাঁদিস না। আমি বড় হলে ক্রিমিনালগুলোকে ঠিক শাস্তি দেব।“

কথাগুলো মনে পড়তে চোখের কোনে জল চলে এলো মনালীর। ওড়না দিয়ে জলটা মুছে নিলো সে। তার বাড়ী এসে গেছে। সীট থেকে উঠে বাসের দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে।

কিছুতেই ঘুম আসছে না অনির্বাণের। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছে মনালীর মুখ, তার হাসি। লজ্জায় রাঙা মুখটা মনে পড়লেই বুকের মধ্যে শিহরণ হচ্ছে। তার নিঃশ্বাস যেন এখনও অনুভব করতে পারছে অনির্বাণ। মনালীর সাথে কাটানো সময়টুকুর স্মৃতি সে বারবার রোমন্থন করে চলেছে। মোবাইলে সময়টা দেখল সে- আড়াইটে। এবার ঘুম চাই। পরদিন অফিস আছে। নাম্বার গোনা শুরু করল সে। ২৫ পেরনোর আগেই মনালীর হাসি গণনা ওলটপালট করে দিল।

এ কী হয়েছে অনির্বাণের! নিঃসঙ্গ, সাধারণ জীবন ছিল তার। দমকা হাওয়ার মত এসে মনালী যেন ওলটপালট করে দিয়েছে তার জীবন। সারাক্ষণ চিন্তার মধ্যে মনালী। সর্বক্ষণ ইচ্ছে করছে মনালীর সংস্পর্শে থাকতে, তার সাথে কথা বলতে। তাকে ছাড়া শূন্য লাগছে জীবনটা। রমেশের কথাই তাহলে ঠিক, সে প্রেমে পড়েছে। উৎফুল্ল হয়ে সে বলে উঠল- “ইয়েস, অ্যাই আম ইন লাভ।“

সকালে মোবাইলের নিষ্ঠুর অ্যালার্মটা তার রাতের ছোট ঘুমটা ভাঙিয়ে দিল। অফিস যেতে ইচ্ছে করছে না তার। কিন্ত সে নিরুপায়- নিজে থেকেই অফিসে থাকবার অঙ্গীকার করেছিল। নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করল সে। মনালীর সাথে আগে দেখা হলে সে আজ ছুটি নিয়ে সারাটা দিন মনালীর সাথে কাটাতে পারত।

মনালীর কথা ভাবতে গিয়ে অফিস বেরোতে দেরী হয়ে গেল তার। বাইকটাকে টেনে বাড়ী থেকে বের করার সময় পাড়ার মধ্যে সুনীলকে দেখতে পেল। মনালীর কথাগুলো মনে পড়ে গেল। ভীষণ লজ্জিত হয়ে পড়ল সে। মিথ্যা দোষারোপ করে তার প্রিয় বন্ধুকে এই দু বছর দূরে সরিয়ে রেখে সে অন্যায় করেছে। কিন্তু কোন মুখ নিয়ে সে সুনীলের মুখোমুখি হবে। সাহস সঞ্চার করতে পারল না সে। সুনীল ততক্ষণে গলি থেকে বাঁক নিয়ে অন্য রাস্তায় চলে গেছে। অনির্বাণ বাইক চালিয়ে অফিস অভিমুখে রওনা হল।

অফিসে আজ কাজ কম। এগারোটায় মিটিং ফেলল অনির্বাণের বস উদয়দা। একে কাজ করতে ইচ্ছে করছে না- তার মধ্যে মিটিং, ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ করল না সে। কিন্তু চাকরিজীবীর পছন্দ-অপছন্দের কোন দাম নেই। ঠিক সময়ে উদয়দার ঘরে উপস্থিত হল সে। পরের মাসের সেলস টার্গেট নিয়ে মিটিং। মাঝপথে অনির্বাণের ফোন বেজে উঠল। সাধারণত ফোন সাইলেন্ট করে সে মিটিং করে। কিন্তু আজ ভুলে গেছে। নাম্বারটা সে চিনতে পারল- আগেরদিন মনালী এই নাম্বার থেকেই কথা বলেছিল। মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল হাসিতে।

সে উদয়দাকে বলল- “উদয়দা, একটা আর্জেন্ট কল আছে। দু-মিনিটের মধ্যে ফিরে আসছি, প্লীজ কিছু মনে করো না।“

উদয়দা সম্মতি দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ফোনটা ধরল অনির্বাণ। তার ধারণাই ঠিক, মনালী ফোন করেছে।

o-TALKING-ON-CELL-PHONE-facebookমনালী- “হ্যালো, আমি মনালী বলছি।“
অনির্বাণ- “হ্যাঁ, মনালী বল। কেমন আছো? কাল ঠিকঠাক পৌঁছেছিলে তো?”
মনালী- “হ্যাঁ, ঠিকঠাক পৌঁছেছিলাম। কাল কথাগুলো শেষ হল না। তুমি বললে সকালের দিকে ফোন করতে, তাই এখন করে নিলাম।“
অনির্বাণ- “ভাল করেছ, তা আজ সাউথের দিকে যেতে রাজী তো?”
মনালী- “হ্যাঁ, কালকেই তো তাই ঠিক হল।“
অনির্বাণ- “জানি, তবু জিজ্ঞাসা করলাম। সকালে হয়ত মাইন্ড চেঞ্জ করলে।“
মনালী- “মাইন্ড চেঞ্জ করার মতো কিছু হয় নি।“
অনির্বাণ- “তাহলে রাসবিহারী মোড়ে দেখা করলে কেমন হয়?”
মনালী- “আমার অসুবিধা নেই।“
অনির্বাণ- “বেশ। তবে ভিড় থাকবে। বেহালা যাবার অটো স্ট্যান্ডের সামনে আমরা মিট করব। ঠিক আছে?”
মনালী- “আচ্ছা।“
অনির্বাণ- “কটা নাগাদ আসতে পারবে বল?“
মনালী- “আজ পেপারে দেখলাম বজ্র-বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। তাই একটু আগে দেখা করলে ভাল হয়।“
অনির্বাণ- “আগে বলতে কটায়?”
মনালী- “এই ধর পাঁচটা নাগাদ।“
অনির্বাণ- “বেশ, পৌঁছে যাব। তবে আবহাওয়া দপ্তর বলেছে মানে আজ নিশ্চিন্তে ছাতা ছাড়াই বেরোনো যাবে।“

অপরপ্রান্তে মনালীর হাসির আওয়াজ সে শুনতে পেল।

অনির্বাণ- “যাক ভালই হল। তোমার সাথে বেশিক্ষণ ঘোরা যাবে।“
মনালী হাসি থামিয়ে বলল- “আচ্ছা, এখন রাখছি। দেখা হবে।“

মুখের প্রশস্ত হাসিটা চেপে আবার উদয়দার ঘরে ঢুকল অনির্বাণ। আবার মিটিং চলল। মিটিং শেষ হতেই চেয়ার থেকে উঠে মাথা চুলকে অনির্বাণ বলল- “উদয়দা, আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরতে হবে, অসুবিধা নেই তো?”
উদয়দা- “তা নেই? তবে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরছিস। ব্যাপার কী? কোন মেয়ের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে নাকি?”
অনির্বাণ- “ধ্যুর, কি যে বল।“
উদয়দা- “অস্বীকার করলি না তো, তার মানে আছে। তাহলে কাল বাকীরা যা বলছিল তাই ঠিক। একেবারে প্রেমে পড়েছিস তো।“
অনির্বাণ- “আরে, ওরা কী সব উল্টোপাল্টা কথা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। ঐরকম কিছু হয় নি।“
উদয়দা- “দেখ, আমার বহুবার প্রেমে পড়ার এক্সপেরিয়েন্স আছে। আমাকে লুকিয়ে লাভ নেই। প্রেমে পড়লে মানুষকে খুব সহজে বোঝা যায়। মিটিঙের মাঝে ফোনে কথা বলে ঢোকার সময়ই বুঝতে পেরেছি। কী ব্যাপার বল তো? দু-তিন দিন আগেও তো কোনরকম চেঞ্জ লক্ষ্য করি নি। পুজোর প্রেম নাকি?”

পুজোর প্রেম কথাটা বেশ লাগল অনির্বাণের। সতিই এবারের পুজোতে মনালীর প্রেমে সে পড়েছে। দু দিনের আলাপেই তার মনের বাঁধ ভেঙে গেছে। উদয়দার কথায় লজ্জা পেয়ে গেল। মুচকি হেসে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে সে বলল- “ধ্যুর, ঐ রকম কিছুই নয়।“

উদয়দা- “আচ্ছা বুঝেছি। স্বীকার করতে চাস না। এ একেবারে টিপিক্যাল প্রেমের সিম্পটম। তা যাক, প্রেম করা ভাল। শরীর, মন ভাল থাকে। তবে বুঝলি পুজোর প্রেমের ব্যাপারটাই আলাদা- চারিদিকে ফেস্স্টিভ মুড। তার মধ্যে একজনের সাথে পরিচয়, ভাল লাগা, ভালোবাসা- এর মাত্রাই আলাদা। তোকে দেখে আমার পুরানো পুজোর প্রেমের কথা মনে পড়ে গেল। চল বস, তোকে সেই গল্প শোনাই। এমনিতে কি পুজোর দিন কাজ করতে ভাল লাগে?”

উদয়দার কথা শুনতে খারাপ লাগছে না অনির্বাণের। সে আবার চেয়ারে বসে পড়ল।

উদয়দা- “তখন বুঝলি কলেজে পড়ি- সেকেন্ড ইয়ার। আমাদের পাশের বাড়ীতে একটা মেয়ে এলো। সে আমার পাশের বাড়ীর রাখী বাঁধা বোন নমিতার মাসীর মেয়ে- নয়না। ছাত থেকেই আলাপ পরিচয় হল। প্রথম দেখাতেই ভাল লেগে গেল নয়নাকে- সুন্দরী, হাসিখুশি, বেশ মার্জিত ব্যাবহার। নয়না আসার খবর নমিতা আমাকে আগেই দিয়েছিল। তার কারণ পুজোর সবকটা দিন নমিতার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘোরার প্লান ছিল আর আমার উপর দায়িত্ব ছিল পুজো দেখানোর নাম করে ওকে বাড়ী থেকে বের করার।

প্লান মত কাজ করলাম। দুপুরে খাবার পর নমিতাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। নয়নাও সাথে এলো। তারপর এক জায়গায় নমিতা বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে গেল। পড়ে থাকলাম নয়না ও আমি। বাড়ী ফেরা সম্ভব নয়। তাই দুজনেই ঠাকুর দেখতে বেরোলাম। কিছুক্ষণ কথা বলার মধ্যে দুজনের মধ্যে আড়ষ্টতা কেটে গেল। প্রাণ খুলে গল্প করলাম, খেলাম, ঘুরলাম। তারপর যথাসময়ে নমিতাকে মিট করে বাড়ী ফিরে এলাম। রাতে হাঁটতে গিয়ে ছাত থেকেই নয়নার সাথে অনেক রাত পর্যন্ত কথা বললাম। পরের তিন দিনও রুটিন চেঞ্জ হল না। পুজোর চারদিন মনের পরিবর্তন বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু একাদশীর দিন নয়না চলে যাওয়ার সময় বুঝতে পারলাম প্রেমে পড়েছি।

লাজুক ছিলাম তখন। কাউকে কথাটা বলতে পারলাম না। কিন্তু বন্ধুদের কাছ থেকে কি প্রেম লুকিয়ে রাখা যায়? কয়েক মাসের মধ্যে ধরা পড়ে বন্ধুদের সব কথা বললাম। কথাটা নয়না চলে যাওয়ার আগে বলতে পারি নি বলে ওরা ভীষণ খিস্তি দিল। পরের পুজোয় আবার নয়নার আসার কথা হল। সপ্তমীর দিনই নয়নাকে একা পেয়ে মনের কথা খুলে বললাম। ও গম্ভীর হয়ে জানাল ওর এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে। কয়েকমাস পরে বিয়ে। উত্তর শুনে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের মাত্রা বেড়ে গেল নমিতার কাছে বাকী কথা শুনে। নয়না চলে যাবার পর নমিতা বলেছিল নয়না সেদিন ভীষণ কান্নাকাটি করেছিল। নমিতাকে বলেছিল আমাকে নয়নার ভীষণ ভাল লেগেছিল। প্রত্যাশাও করেছিল আমার কাছ থেকে একবছর আগে কথাগুলো শোনার। কিন্তু আমার দিক থেকে কোন প্রতিশ্রুতি না পেয়েই ও বিয়েতে রাজী হয়েছে।“

উদয়দার গল্প শুনে মনটা ভারি হয়ে গেল অনির্বাণের। বলল- “তারপর?”

উদয়দা- “তারপর আর কি? এটা তো আর সিনেমা নয়, যে ইন্টারেস্টিং কিছু ঘটবে। বিয়ে হয়ে গেল নয়নার। সেইবার একটা ভীষণ শিক্ষা পেয়েছিলাম- প্রেমে কখনও বলতে দেরী করতে নেই। টাইমিং ইজ ক্রুশাল। ঠিক সময়ে বলতে না পারলে সব শেষ হয়ে যেতে পারে।“

অনির্বাণকে গম্ভীর দেখে উদয়দা বলল- “চল, চা খেয়ে আসি।“

লাঞ্চ করেই বাড়ী ফিরে এলো অনির্বাণ। মনালীর সাথে দেখা হবার যেমন এক্সাইটমেন্ট হচ্ছে, তেমনি মাথায় বারবার চলে আসছে উদয়দার কথাগুলো। প্রেমে প্রপোজ করাটা জরুরী। সে যে মনালীর প্রেমে পড়েছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে মনালীরও কি তার মতো অবস্থা- সে জানে না। মনালীর কাছে এটা হয়ত নিছক বন্ধুত্ব। সে বন্ধুহীনা, তাই হয়তো শুধু বন্ধুত্বের খাতিরে সে তার সঙ্গে মিশেছে। কিন্তু গতকালের ঘটনাও কি বন্ধুত্বের সম্পর্কে স্বাভাবিক? বৃষ্টি থেকে বাঁচতে তারা প্রায় আলিঙ্গনবদ্ধ অবস্থায় ছিল। সে ইতস্তত করলেও মনালী জোর করেই তার কাছে আসতে বলে। অনির্বাণ সেই অবস্থায় তার সঙ্গে বিশ্রী কিছু কাজও করতে পারত। তার আশঙ্কা সে গ্রাহ্য করে নি। এর অর্থ অনির্বাণকে সে বিশ্বাস করে। নিশ্চয়ই তার প্রতি মনালীর ভাল ধারণা ও সফট কর্নার রয়েছে। মনটা খুশিতে ভরে উঠল অনির্বাণের। এই অবস্থায় প্রপোজ করা যেতেই পারে। কিন্তু মাত্র দু দিনের আলাপে কি প্রপোজ করাটা ঠিক? মনালীও খারাপ ভাবতে পারে এই হঠকারিতার জন্য। এদিকে মনালীর সাথে দেখা করার আর ছুতো অনির্বাণের কাছে নেই। পরদিন বিজয়া দশমী, প্রতিমা বিসর্জন হবে। তাই পুজো দেখতে বেরোনো সম্ভব নয়। কী অজুহাতে সে মনালীকে আবার দেখা করতে বলবে। পুজোর পর অফিসে কাজের চাপ বাড়বে। কলকাতার বাইরেও ঘন ঘন যেতে হবে তাকে। মনালীও হয়ত ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন কথাগুলো বলার সময় পাওয়া যাবে কিনা সেটা অনিশ্চিত। উপরন্তু মনালীর জীবনে অন্য কেউ চলে এলে উদয়দার গল্পের মত অবস্থা হয়ে যাবে। মন শক্ত করল অনির্বাণ। আজ তাকে প্রপোজ করতেই হবে।

letterআয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে কীভাবে মনালীকে বলবে তার রিহার্সাল শুরু করল। আধঘণ্টা চেষ্টা করে সে বুঝতে পারল এভাবে বলা সম্ভব নয়। তাহলে উপায়? সে ভাবতে থাকল। উত্তরও পেয়ে গেল- চিঠি। লিখতে বসে গেল সে। কিন্তু এহেন চিঠি লেখাটাও সহজ নয়। কোনরকমে চিঠিটা চারটের মধ্যে লেখা শেষ করে ঝড়ের বেগে স্নান করে বেরোবার জন্য রেডি হয়ে নিলো।

রাসবিহারী মোড়ে পৌঁছে সে দেখল মনালী তখনও আসে নি। সে অপেক্ষা করতে থাকল। অপেক্ষা করাটা এতটা উত্তেজনাময় সে কখনও জানত না। মনে টেনশন হচ্ছে। বারবার জিন্সের পকেটে চিঠিটা চেক করে নিচ্ছে। ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। মনালী আজ অনেকটাই লেট করছে। মোবাইলটা বেজে উঠল অনির্বাণের- এক সহকর্মীর ফোন। কাজ সংক্রান্ত কিছু কথা বলে নিতে হল তাকে। ফোনটা শেষ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে অবাক হয়ে গেল। এ কাকে দেখছে সে। আজ মনালীকে অপরূপা সুন্দরী লাগছে। সে আজ মেকআপ করেছে। গোলাপি বর্ডারযুক্ত হলুদ সালোয়ার কামিজের সঙ্গে ঠোঁটের গাঢ় গোলাপি রংটা চমকপ্রদ লাগছে। সূর্যের আলোতে মুখটা গ্লো করছে। কাজলটানা চোখের মধ্যে সে কিছুক্ষণ হারিয়ে গেল। সম্বিৎ ফিরে পেতেই মোবাইলটা তুলবার জন্য নিচু হল। কিন্তু মাথা ঠুকে গেল মনালীর সঙ্গে। অনির্বাণের অবস্থা দেখে সেও মোবাইলটা তোলার জন্য নিচু হয়েছিল। “উঃ”- শব্দ করে দুজনেই উঠে পড়ল। দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।

মনালী- “একটু লেট করেছি বলে মাথা ঠুকে দেবে?”
অনির্বাণ লজ্জা পেয়ে বলল- “এ বাবা। সরি, তোমার বোধহয় ভীষণ লেগেছে।“
মনালী- “না না সেরকমও লাগে নি। তবে তোমাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল।“
অনির্বাণ- “সেরকমও দেরী কর নি। অফিসের কাজে ক্লায়েন্টদের জন্য দু-তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আমার অভ্যাস আছে।“
মনালী- “কোন দিক থেকে ঘোরা শুরু করবে ঠিক করেছ?”
অনির্বাণ- “চল গড়িয়াহাটের দিকে একটু যাওয়া যাক। তারপর ফিরে এসে বেহালার দিকে যাওয়া যাবে। কি বল?”
মনালী- “বেশ, তাই চল।“

দুজনে রাসবিহারী এভিনিউ ধরে দেশপ্রিয় পার্কের দিকে যাত্রা শুরু করল। দেশপ্রিয় পার্কের পুজো দেখার পর তারা দেখে নিলো ত্রিধারা সম্মিলনী ও সিংহী পার্কের পুজো। পরের গন্তব্যস্থল একডালিয়া এভারগ্রীন। মনালী আজ অনেক কথা বলছে। গড়িয়াহাট তার অতি পরিচিত জায়গা। প্রধানত শপিং-এর কথাই সে বলে চলেছিল। রাস্তা পেরোনোর সময় কথায় মত্ত মনালী খেয়াল করল না রাস্তার দিকে। হটাত অনির্বাণ লক্ষ্য করল একটা গাড়ি বাঁক নিয়ে দ্রুতগতিতে মনালীর দিকে ধেয়ে আসছে। সে মনালীর হাতটা ধরে তাকে ফুটপাথের দিকে টেনে নিলো। গাড়িটা স্পীড না কমিয়েই তাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় মনালী বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।

অনির্বাণ উত্তেজিত হয়ে বলল- “কী করছিলে? দেখে রাস্তা পার হবে তো। গাড়িটা আর একটু হলেই চাপা দিচ্ছিল।“

মনালী মাথা নিচু করে রইল। অনির্বাণের খারাপ লাগল- এইভাবে বোধহয় তার বলা উচিৎ হয় নি। রাস্তা পার হবার সময় নিজের অজান্তে বাঁ হাতটা মনালীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সে বলল- “এস।“ মাকে সে আগে এইভাবে রাস্তা পার করত। মনালী ডান হাত দিয়ে তার হাতটা ধরল। নরম হাতের স্পর্শ অনির্বাণকে শিহরিত করল। রাস্তা পার হয়েও মনালীর হাতটা ছাড়তে ইচ্ছে করল না তার। মনালীও হাতটা সরিয়ে নিলো না। কিন্তু উল্টোদিকের জনস্রোতের জন্য তারা হাত ছাড়তে বাধ্য হল।

সন্ধ্যের স্নাক্স হিসেবে আলু-কাবলি ও ঝাল মুড়ি খেয়ে নিলো তারা। তৃষ্ণা মেটাল ঠাণ্ডাই খেয়ে। এরপর বাসে চড়ে তারা আবার চলে এলো রাসবিহারী। বাস চেঞ্জ করে চেতলার দিকে রওনা দিল। প্রথমে তারা দেখল চেতলা অগ্রণী, তারপর মিতালী সংঘ। বেহালা শ্রী সংঘ দেখে বেরোনোর পর শুরু হল মুষলধারায় বৃষ্টি। কাছেই একটা বাড়ীর রাস্তার দিকে বেরিয়ে আসা বারান্দার নীচে আরও কিছু দর্শনার্থীদের সাথে তারা আশ্রয় নিলো।

মনালী- “আজ আবহাওয়া দপ্তর তাহলে ঠিক প্রেডিক্ট করেছে বল?”
অনির্বাণ- “তাই দেখছি। তা একশটা প্রেডিক্ট করলে একটা তো লাগবেই।“

দুজনে গল্প গুজব শুরু করল। আধঘণ্টা পেরিয়ে গেল, কিন্তু বৃষ্টির তেজ এক ফোঁটাও কমল না।

অনির্বাণ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল- “মনে হচ্ছে এক-দেড় ঘণ্টার মধ্যে এই বৃষ্টি থামবে না।“
মনালী- “আমারও তাই মনে হচ্ছে।“
অনির্বাণ- “এক কাজ করি ডিনার করে ফেলি। বসার জায়গাও পাওয়া যাবে।“
মনালী- “সেটা তো ভাল আইডিয়া, কিন্তু ডিনার কোথায় করবে?”

অনির্বাণ রাস্তার ওপারে একটু দূরে ত্রিপল টাঙানো একটা খাবার জায়গা দেখাল। কিন্তু ওখানে পৌঁছবে কী করে? মনালীর কাছে ছাতা আছে, কিন্তু অনির্বাণের হাত ফাঁকা।

অনির্বাণ- “তুমি ছাতা নিয়ে ওখানে পৌঁছে যাও। তারপর আমি দৌড়ে ওখানে পৌঁছে যাব।“

মনালী রাজী হল না। বলল- “কোন দরকার নেই। চল একসাথে দুজনে ছাতা মাথায় করে যাই। একজনের পুরোপুরি ভেজার থেকে দুজনের অল্প ভেজা ভাল।“

অনির্বাণের প্রতিবাদ মনালী শুনল না। দুজনে মিলে ছাতা মাথায় করে খাবার জায়গায় পৌঁছল। মনালীর বাঁ হাতটা ভিজে গেছে। অনির্বাণ বলল- “দেখলে, তোমার হাতটা ভিজে গেল। আমার খুব খারাপ লাগছে। আমার জন্যই হল এটা।“

মনালী- “আচ্ছা, ঠিক আছে, শুকিয়ে যাবে। অত ভাববার কিছু নেই। তোমারও তো ডান হাতটা ভিজে গেছে।“

মোগলাই পরটা ও কোল্ড ড্রিঙ্ক দিয়ে ডিনার সেরে নিলো দুজন। বৃষ্টি অনেকটা কমে গেছে, তবে রাস্তায় জল ভর্তি। মনালী হাতের ঘড়িটা দেখল- সোয়া এগারোটা।

মনালী- “রাস্তায় জল জমে গেছে। এই অবস্থায় ঘোরাটা বেশ ডিফিকাল্ট। বাড়ী ফিরে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।“

মনালীর যুক্তি অকাট্য। দুজনে জমে যাওয়া জল থেকে পা বাঁচিয়ে বাসস্টপের দিকে এগিয়ে গেল। মনালীর সঙ্গে এতক্ষণ কাটানোর সময় অনির্বাণ চিঠির কথা ভুলে গিয়েছিল। বিদায়ের কথা শুনে তার মনে পড়ে গেল। চিঠিটা মনালীকে দিতেই হবে। কিন্তু কী ভাবে, কী বলে দেবে সে কিছু বুঝে পেল না। টেনশনে পড়ে গেল সে।

বাসস্টপ পৌঁছতেই দূরে একটা বাস দেখে মনালী হাত দেখাল। অনির্বাণ হতাশ হয়ে পড়ল। আর একটু সময়ও সে পেল না। এই সামান্য কটা মুহূর্তের মধ্যে সে চিঠিটা দেবে কী করে? স্টপে এসে বাসটা দাঁড়াল। মনালী বিদায় জানিয়ে বাসের দিকে এগিয়ে গেল। মনটা দুঃখে ফেটে গেল অনির্বাণের। কোনরকমে মনটা শক্ত করে বলল- “মনালী, পরের বাসটাতে গেলে কি খুব দেরী হয়ে যাবে?”

মনালী অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল- “কেন?”

উত্তর দিতে পারল না অনির্বাণ, চোখে জল চলে এলো। সে অন্যদিকে তাকাল। বাসটা স্টপ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ফিরে তাকাতেই দেখল মনালী তার দিকে এগিয়ে আসছে। খুশিতে ভরে গেল মন- একটা সুযোগ সে পেয়েছে।

মনালী এসে জিজ্ঞেস করল- “কী হয়েছে? কিছু বলবে?”

অনির্বাণ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

মনালী- “বল। এই বাসটা ছেড়েছি, পরের বাসটাতে কিন্তু চলে যাব। তাড়াতাড়ি বল।“

অনির্বাণ পকেট থেকে চিঠিটা বার করে মনালীর হাতে দিল। মনালী গম্ভীর হয়ে চিঠি খুলে পড়া শুরু করল।

মনালী,
আমাদের আলাপ দুদিনের হলেও কেন জানি মনে হয় তোমাকে বহুবছর চিনি। তোমার সঙ্গে এই কদিনের আলাপে আমার জীবনটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। সারাক্ষণ শুধু তোমার কথাই মনে পড়ে। তুমি যতক্ষণ কাছে থাক মনটা শান্ত থাকে। তুমি চলে যাওয়ার পর মনটা দুঃখে ভরে যায়। লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট কথাটা কোনদিন বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু আজ উপলব্ধি করি। তোমাকে শুধু মন থেকে একটা কথা বলতে চাই- অ্যাই লাভ ইয়ু।
-অনির্বাণ

অনির্বাণের হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। মনালী চিঠিটা পড়া শেষ করে ভাঁজ করে অনির্বাণকে ফিরিয়ে দিল। বলল- “আমি কারুর ভালবাসার যোগ্য নই।“
মনালীর অপ্রত্যাশিত উত্তরে হতভম্ব হয়ে অনির্বাণ বলল- “মানে?”
মনালী- “তুমি আমার পাস্ট সম্বন্ধে জান না বলে এই কথা লিখেছ।“
অনির্বাণ- “তোমার পাস্টের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?”
মনালী- “সম্পর্ক আছে বলেই বলছি। গত বছর অষ্টমীর রাতে একটি মেয়ে গ্যাং-রেপড হয়েছিল। আমিই সেই মেয়ে।“

মাথায় যেন বজ্রপাত হল অনির্বাণের। পা থেকে যেন মাটি সরে গেল। বাসস্টপের দেওয়ালে তার পিঠ ঠেকে গেল। কোন কথা বলতে পারল না। ইতিমধ্যে মনালীর বাস চলে এসেছে। সে আর সময় নষ্ট না করে বাসে উঠে পড়ল।

১০

ঝির ঝির বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ হেঁটে বাড়ী ফিরল অনির্বাণ। তার চিন্তা ভাবনা সব ওলটপালট হয়ে গেছে। মনালীর স্বীকারোক্তি তার মনটা ছারখার করে দিয়েছে। জীবনে প্রথমবার প্রেমের স্বাদ পেল- তাও কিনা একজন ধর্ষিতার কাছ থেকে। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস।

ভিজে জামাকাপড় ছেড়ে বাড়ীর পোশাক পরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে। বাইরে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। মনালীর কথা মনে ভাসতে শুরু করল। আজ সে কয়েকটা অজানা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে- মনালীর কেন বন্ধু নেই, কেন সে পরিবারের সাথে ঘুরতে না গিয়ে একজন অজানা মানুষের সাথে পুজোর আনন্দ উপভোগ করছে। মনালী বেশ মিশুকে ও কথা বলতে ভালবাসে। তার তো বন্ধুর অভাব হবার কথা নয়। তাহলে শুধুমাত্র একটা ঘটনা তাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে। এক জনসমুদ্রের মধ্যে একা থাকা যে কী কঠিন তা ভয়ঙ্কর ভাবে সত্যি মনালীর জীবনে। তাই সে সপ্তমীর দিন দুঃখ লাঘবের জন্য বাবুঘাটে এসেছিল।

আজকাল কাগজে প্রতিদিন কমপক্ষে একটা ধর্ষণের খবর থাকেই। খবরগুলো অনির্বাণকে ব্যথিত করে। সব থেকে তার খারাপ লাগে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্রিমিনালদের সাজা হয় না। এই নিয়ে অফিসে আলোচনা হলে সে যোগ দেয়। কিন্তু সে কখনও রেপ ভিকটিম সম্বন্ধে ভেবে দেখে নি। কী ভয়ঙ্কর দুঃখের জীবন তাদের। এই ঘৃণ্য অত্যাচার তাদের মান-সম্মান, সত্ত্বা, আত্মমর্যাদা সবকিছু কেড়ে নিয়ে অর্ধমৃত করে দেয়। বাকীটা শেষ করে দেয় নিষ্ঠুর সমাজ- তাদের লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, বঞ্চনা ও অপমানের পাত্রী করে। এই মানসিক আঘাত থেকে বের হতে শুধু শারীরিক, মানসিক কষ্ট অতিক্রম নয়, যুদ্ধ করতে হয় সমাজের মানুষদের সাথে। অথচ এই ঘটনার জন্য তারা কোন অংশে দায়ী নয়।

কী অসম্ভব মানসিক শক্তি মনালীর। এত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফেরার চেষ্টা করছে সে। নিজের দুঃখ চেপে রেখেও কত সহজে সে অনির্বাণের দুবছরব্যাপী কষ্ট নিমেষের মধ্যে লাঘব করে দিয়েছে। তার প্রতিদানে অনির্বাণ সমাজের বাকী মানুষগুলোর মত ব্যবহার করল। মনালীর প্রতি এই ছিল তার ভালোবাসা। নিজেকে ধিক্কার জানাল সে। মুহূর্তের হতভম্বতায় নির্বাক থেকে সে যে ভুল করেছে তার ক্ষমা হয় না। মনকে শক্ত করল সে। এই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। সে নিজের ভালবাসাকে এভাবে হারিয়ে যেতে দেবে না।

মন খারাপ নিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে মনালীর স্বপ্ন দেখল। মনালী ও সে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে। কয়েকজন মুখোশ পরা লোক মনালীকে তার থেকে আলাদা করে দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছে। মনালী তার দিকে তাকিয়ে আছে সাহায্যের জন্য। হাতপা ছুঁড়ে, দৌড়েও সে পৌঁছতে পারছে না মনালীর কাছে। বিছানা ছেড়ে হাঁসফাঁস করে উঠে পড়ল সে। থিতু হতে কিছুক্ষণ সময় নিলো, তারপর আবার সে ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরে মায়ের স্বপ্ন দেখল সে।

১১

সকালে দুধ কিনতে গিয়ে সে দূরে মিষ্টির দোকানে সুনীলের মাকে দেখল। আজ বিজয়া দশমী। পুরানো দিনের কথাগুলো তার মনে পড়ে গেল। বিজয়ার দিন সে সুনীলের বাড়ীতে প্রণাম ও কোলাকুলি করতে যেত। কাকিমা ঘুগনি ও রসগোল্লা খাওয়াতেন। মনালীর কথাগুলো মনে ভেসে এলো। বাড়ী ফিরে জলখাবার খেয়ে স্নান করে নিলো সে। একটা ভাল পোশাক পরে দোকান থেকে সন্দেশ কিনে উপস্থিত হল সুনীলের বাড়ীতে।

অনির্বাণকে দেখে সুনীলের বাবামা খুশি হলেন। অনির্বাণ ওদের প্রণাম করল। সুনীলের মা সুনীলকে হাঁক দিলেন। সে স্নান করছে। তার আসা পর্যন্ত সুনীলের বাবার সঙ্গে কথা বলল অনির্বাণ। সুনীলকে দেখে খুশি হয়ে গেল সে। কোলাকুলি করতে গিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। চোখের কোনে জল চলে এলো। অনেকদিন বাদে বন্ধুকে পেয়ে ভীষণ ভাল লাগছে তার। মনালীকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাল সে। সুনীলের মা তাকে বসতে বললেন খাবার তৈরি নয় বলে। অন্য একদিন আসব বলে সুনীলকে নিয়ে বেরিয়ে পাড়ার মোড়ে বেশ অনেকক্ষণ আড্ডা মেরে নিলো সে।

বাড়ী ফিরে আগের দিন রাতের কথা মনে পড়ে গেল তার। মনালীর সাথে তাকে দেখা করতেই হবে। ক্ষণিকের হতভম্বতায় মনালী তার সম্বন্ধে নিশ্চয়ই ভুল ধারণা করেছে। মোবাইলটা নিয়ে মনালী যে নাম্বার থেকে দুদিন ফোন করেছিল সেই নাম্বার ডায়াল করল। অপরপ্রান্তে এক পুরুষ কণ্ঠস্বর ভেসে এলো- “হ্যালো।“
অনির্বাণ- “মনালী আছে?”
পুরুষ কণ্ঠস্বর – “অ্যাঁ কে?”
অনির্বাণ- “মনালীকে একটু ফোনটা দেবেন?”
পুরুষ কণ্ঠস্বর- “মনালী বলে কেউ থাকে না এখানে।“
অনির্বাণ- “কী যা তা বলছেন। এইখান থেকেই তো মনালী গত দুদিন ফোন করেছে।“
পুরুষ কণ্ঠস্বর- “ও বুঝেছি। দাদা একা একটা পাবলিক ফোন। কেউ এখান থেকে আপনাকে ফোন করেছিল।“

মাথায় বজ্রাঘাত হল অনির্বাণের। মনালী নিজের বাড়ী থেকে ফোন করে নি। তাহলে মনালীকে সে খুঁজবে কি করে? চিন্তা করে কিছু পেল না। সে আবার ফোনে কথা বলে জায়গাটা জেনে নিলো। মনালী নিশ্চয় সেখানকার বাসিন্দা হবে। রেডি হয়েই ছুটল সেখানে। বর্ণনা দিতেই দোকানদার সনাক্ত করতে পারল মনালীকে। কিন্তু কোন বাড়ী বা কোন দিক তার হদিশ দিতে পারল না। অনির্বাণ হাল না ছেড়ে কাছাকাছি পাড়াগুলোতে মনালীকে খোঁজার চেষ্টা করল। কিন্তু এই জনারণ্যে সে মনালীকে কী করে খুঁজে পাবে? দেড় ঘণ্টার ব্যর্থ চেষ্টা করে হার মেনে বাড়ী ফিরল সে।

মনালীকে কী সে চিরদিনের মত হারিয়ে ফেলল? মনালীকে খোঁজার সূত্র তার কাছে আর কিছু নেই। কী করবে সে এখন? মনালীর বিরহে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। মনমরা হয়ে সে মনালীর সঙ্গে কাটানো সময়গুলোর কথা ভাবতে শুরু করল। হয়ত এই কদিনের স্মৃতি নিয়েই তাকে থাকতে হবে। ভাবতে ভাবতে হটাত তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মনালীর কথাগুলো মনে ভাসতে থাকল-“মন খারাপ হলেই এখানে চলে আসি“। মন যেন উজ্জীবিত হয়ে জানাল মনালীকে নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে বাবুঘাটে।

durga_idol-660_101513022457

বিকেল হয়ে গেছে। সময় নষ্ট না করে বাবুঘাটে পৌঁছে গেল অনির্বাণ। কিন্তু একী? এতো লোকে লোকারণ্য। প্রতিমা ভাসানোর জন্য সহস্রাধিক লোক বাবুঘাটে জড়ো হয়েছে। মহিলারা নিজেদের মধ্যে সিঁদুর খেলছে। ঢাকিদের তালে কিছু ভক্তরা নেচে চলেছে। সাতপাক ঘুরিয়ে প্রতিমাকে গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। এত ভিড়ের মধ্যে কি মনালী আসবে? একবার যখন এসে পড়েছে সে খুঁজে দেখবে। বাবুঘাট ছাড়া অন্য কোথাও মনালীকে সে কিভাবে খুঁজবে?

খোঁজ শুরু করল সে। প্রথমে ধাক্কাধাক্কি করে ছাতযুক্ত বাঁধান জায়গাটায় পৌঁছল। প্রতিটি মেয়েকে ভাল করে লক্ষ্য করল- মনালী এদের মধ্যে নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে জনস্রোতের একপ্রান্তে গেল। যতটা সম্ভব প্রতিটি মেয়েকে লক্ষ্য করল সে। এরপর আবার দেখতে দেখতে পৌঁছল অপর প্রান্তে। মনালীর দেখা নেই। তবু হাল না ছেড়ে আরও দুবার জনসমুদ্রের মধ্যে সে চালাল অনুসন্ধান। শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ল ব্যর্থতায়। ভিড় থেকে দূরে একটা পাথরের বসার জায়গা দেখে সে সেদিকে এগিয়ে গেল। হটাত এক দমকা বাতাসে তার নাকে একটা পরিচিত পারফিউমের গন্ধ ভেসে এলো। সে তাকিয়ে দেখল একটু দূরে একজন সাদা সালোয়ার কামিজ পরা মহিলা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না। তার ওড়না ও চুল বাতাসে উড়ছে। মুখটা দেখার জন্য সে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। মন ভুল অনুমান করে নি। মনালীই উদাস হয়ে একদৃষ্টে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আছে।

অনির্বাণ তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল- “মনালী।“
মনালী ফিরে তাকিয়ে অনির্বাণকে দেখে একটু শুকনো হাসার চেষ্টা করল। বলল- “ওঃ তুমি।“
অনির্বাণ- “কাল হটাত চলে গেলে কেন?”
মনালী- “পরের বাসটা চলে এলো যে। তাই চলে এলাম।“
অনির্বাণ- “সকালে ফোন কর নি কেন?”
মনালী- “ফোন করার তো কথা ছিল না।“
অনির্বাণ- “কিন্তু, কাল যে কথা শেষ হল না।“
মনালী মাথা নিচু করে বলল- “আর তো কোন কথা থাকতে পারে না।“
অনির্বাণ- “তুমি বললেই কি কথা শেষ হয়ে যাবে? এদিকে এস।“

হাতটা ধরে কাছে পাথরের জায়গায় মনালীকে বসিয়ে দিল অনির্বাণ। সেও মনালীর পাশে এসে বসল। মনালী ফুটপাথের দিকে তাকিয়ে রইল। অনির্বাণ ডান হাত দিয়ে মনালীর ডান হাতটা ধরল। তার উপর নিজের বাঁ হাতটা রাখল। মনালী ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না।

অনির্বাণ- “আজ তোমাকে অন্য কথা বলতে চাই। দুই দিন তোমার সঙ্গে ঘুরে মনটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু একদিনের বিরহে বুঝতে পেরেছি তোমাকে ছাড়া আমার বাঁচা সম্ভব নয়। মনালী, উইল ইয়ু ম্যারী মি?”

হাতদুটো শিথিল হয়ে গেল অনির্বাণের। মনালী হাতটা টেনে নিয়ে দু হাত দিয়ে মুখটা ঢাকল। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুক খুক করে কান্না শুরু করে দিল সে।

দশ মিনিট হয়ে গেছে। মনালীর কান্না থামে নি। কান্না একটু কমতে অনির্বাণ বলল- “জান, আজ অনেকদিন পর মায়ের স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমাদের বাড়ী খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। মা একটা সুন্দর শাড়ী পরে কাজের তদারক করছে। পাশের বাড়ীর কাকিমা মাকে জিজ্ঞেস করল- ‘কী হয়েছে? বাড়ী এত সুন্দর করে সাজাচ্ছ যে?’ মা বলল- ‘সাজাব না লক্ষ্মী আসছে যে আমাদের ঘরে।‘ কাকিমা বলল- ‘লক্ষ্মী আসছে মানে?’ মা হেসে বলল- ‘আমার অনির্বাণ বৌ নিয়ে আসছে যে।‘“

মনালী কোন কথা বলল না। তার কান্নার তীব্রতা আবার বেড়ে গেল।

১২

6678455-lg

একটা বছর পেরিয়ে গেছে। আবার ফিরে এসেছে বাঙালীর সেরা উৎসব দুর্গাপূজা। মহাসপ্তমীর সন্ধ্যে। বাবুঘাট সংলগ্ন গঙ্গার উপর একটা নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে। মাঝি হাল ধরে সঠিক দিকে সঞ্চালন করছে নৌকাটাকে। উল্টোদিকে এক যুবক ও যুবতী পাশাপাশি পরস্পরকে স্পর্শ করে বসে আছে। যুবকটির পরনে সাদা পাঞ্জাবী ও নীল জিন্সের প্যান্ট। যুবতীটি পরে আছে সোনালী পাড়যুক্ত লাল শাড়ী ও ম্যাচিং ব্লাউজ। যুবকটির বাঁ হাত যুবতীটির কোমর স্পর্শ করে আছে। মৃদুমন্দ বাতাসের মধ্যে তারা গঙ্গাকে উপভোগ করছে। দূরে আলোকিত বিদ্যাসাগর সেতুটিকে সুন্দর লাগছে।

যুবকটি বলল- “মন, ভাল লাগছে?”
যুবতী- “হুঁ।“

মন মাথাটা যুবকটির কাঁধে এলিয়ে দিল। বাঁ হাতটা যুবকটির বুকের উপর রেখে ডান হাতটা স্পর্শ করল যুবকটির কোমরে। যুবকটি খুশি হয়ে মাথাটা মনের মাথার উপর ঠেকিয়ে দিল।

ঘাটের ছাতযুক্ত বসার জায়গাটা দেখিয়ে যুবকটি বলল- “মন, মনে পড়ে এক বছর আগেকার কথা?”
মন- “হুঁ, কথাগুলো আমি কখনও ভুলতে পারি।“ তারপর হেসে উঠে বলল- “তোমার লজ্জা করা উচিৎ। এত বড় ছেলে হয়ে বাচ্চাদের মতন ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদছিলে সেদিন।“
যুবক- “মোটেও না। চোখে শুধু জল চলে এসেছিল।“
মন আলিঙ্গন ছাড়িয়ে যুবকটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- “আচ্ছা, শুধু চোখে জল এসেছিল। তাহলে আমি বুঝলাম কি করে?”
যুবকটি হেসে বলল- “আচ্ছা বাবা, ভ্যাঁ ভ্যাঁ করেই কাঁদছিলাম। এর জন্য আমি কখনও এম্ব্যারাসড ফিল করি না। ভাগ্যিস কেঁদেছিলাম। না হলে কি তোমাকে জীবনে পেতাম? অ্যাই আম সো লাকি তো হ্যাভ ইয়ু ইন মাই লাইফ, মনালী।“

মনালী বলল- “আমি তোমার থেকে বেশি লাকি, বুদ্ধু।“
মনালী অনির্বাণের বুকে মাথা রেখে তাকে আবার জড়িয়ে ধরল। অনির্বাণ বলল- “আচ্ছা বেশ, আমরা দুজনেই লাকি।“

মনালী কিছুক্ষণ পরে স্বস্তির একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল- “নি, চল না আগের সপ্তমীর দিন যা যা করেছিলাম, তাই তাই করি!”
অনির্বাণ- “চল, আমারও ভাল লাগবে। তবে নাগরদোলা উঠার আগে আমি হাতে রুমাল বেঁধে নেব কিন্তু। নখের আঁচড়ে বেশ কষ্ট হয়েছিল।“
মনালী- “আচ্ছা, পিঠে আঁচড় খেতে তো খুব ভাল লাগে। আজ না হয় হাতে আঁচড় খাবে। রুমাল বাঁধা চলবে না।“

দুজনেই হেসে উঠল। মাঝি জানাল আধঘণ্টার নৌকাবিহারের সময় শেষ। অনির্বাণ মাঝিকে নৌকা ঘাটে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলল।

নৌকা থেকে নেমে মনালীর জন্য হাত বাড়িয়ে দিল অনির্বাণ। মনালী তার হাত ধরে নামল। অনির্বাণ আলোতে মনালীর কপাল লক্ষ্য করে বলল- “ইস, তোমার সিঁদুরটা ঘেঁটে গেছে।“

অনির্বাণ রুমাল দিয়ে মুছে সিঁদুরটা ঠিক করে দিল। মনালীও অনির্বাণের গলায় দেখতে পেল সিঁদুরের দাগ। লজ্জা পেয়ে জিভ কেটে হাত দিয়ে দাগটা সে মুছে দিল।

অনির্বাণ হেসে বলল- “চল, একবছর আগের দিনটায় ফিরে যাই।“

দুজনে হাত ধরে হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে ঘাটের উপর উঠতে থাকল। তাদের অনেকটা পথ যেতে হবে।

9e0efad832d6c5154d9cd05d9b725951– সমাপ্ত –

কোলাজ সংস্করণ

pp1 pp2pp3pp4pp5pp6pp7pp8pp9pp10pp11pp12pp13pp14

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s